দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতি তদারকি ও নজরদারি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ক্ষমতার কারণে ব্যাংকিং সেক্টরের শৃংখলা ফিরে আসবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে সৃষ্টি হওয়া নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের (সংশোধিত) খসড়া প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু আইন পাশ করলেই হবে না, এগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও জানান তিনি।
অনুমোদিত খসড়া আইনে ব্যাসেল প্রিন্সিপালের সঙ্গে সঙ্গতি রাখা হয়েছে। প্রথমে ১৯৭৪ সালে ১০টি দেশ ব্যাসেল প্রিন্সিপাল শুরু করে একটি নীতিমালা ঠিক করেছিল। এখন ২৭টি দেশ ব্যাসেল কমিটিতে আছে। এই কমিটি ব্যাংকিং গাইড হিসাবে কিছু নীতিমালা ধারণ করে। এ সংশোধনীতে ব্যাসেল প্রিন্সিপালের সঙ্গে সঙ্গতি রাখা হয়েছে। এ আইনের কোনো বিষয় যদি স্থগিত করতে হয় তাহলে তা বাংলাদেশ ব্যাংক করবে। আগে এটি সরকার করতো। আগে সরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হাতে। অনুমোদিত আইনের এ ক্ষমতা পাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শাস্তির বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনে কোম্পানি আইনের কোন কোন বিধান লংঘন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা না দিলে পরবর্তী প্রত্যেক দিনের জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিধি লংঘনের দায়ে যেকোন ব্যক্তি বা কোম্পানিকে জরিমানা করতে পারবে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১০৯ (২) ধারার অধীনে বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ব্যক্তি এই আইনের কোন বিধানের প্রয়োজন মোতাবেক বা উহার অধীনে বা উহার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে তলবকৃত বা দাখিলকৃত কোন বিবরণ, প্রতিবেদন, ব্যালেন্সশিট বা অন্যান্য দলিল বা কোন তথ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং তাঁহার জ্ঞাতসারে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা তথ্য বা বিবৃতি প্রদান করেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং জ্ঞাতসারে অনুরূপ বিষয়ে তথ্য বা কোন বিবৃতি প্রদান না করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক তিন বত্সরের কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’
সংশোধিত আইনে ঋণখেলাপির সংজ্ঞা সহজ, স্পষ্ট ও বিস্তৃত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সময় সময় মূলধনের যে হার নির্ধারণ করবে সে অনুপাতে মূলধন সংরক্ষণ করবে। তবে বিশেষায়িত ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই আইন থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ থাকবে বলে সংশোধিত আইনে বলা হয়। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সীমা কমানোসহ খসড়ায় যেসব বিষয় অনুমোদন হয়েছে তার ফলে ব্যাংকগুলোর উপর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব অনেকাংশে বেড়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এ খসড়া আবারো মন্ত্রিসভায় উঠবে। তারপর সংসদে তা চূড়ান্তভাবে পাস হবে। ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন করা হয়েছিল। ২০০৩ সালে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ব্যাংকিং খাতে নানা পরিবর্তন এসেছে। এ কারণে বিভিন্ন ধারা সংশোধন করে আইনটি সময়োপযোগী করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসাবে এবং ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সরকার আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
