রাত বাড়ছে। অপেক্ষা যেনো শেষ হচ্ছে না। মহাবিরক্ত মোশারেফ ভাই। এহসান জুয়েল ভাইও বিরক্ত। বেচারার কাছের মানুষটাও সেই বাসে। যে বাসের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। সুন্দরবনের পথে বাস। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে এসেছে। আমরা অপেক্ষা করছি ঢাকায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেবো আমরাও। আমরা বলতে আমি, জুয়েল ভাই, মোশারেফ ভাই, রিয়াজ ভাই, মিলন ভাই, রাসেল ভাই, গোলাম রসুল। সারারাত কেটে গেছে বাসের অপেক্ষায়। অবশেষে সকাল দশটায় বাসে উঠলাম। যাক হাফ ছেড়ে বাঁচা গেলো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ভ্রমণ যে কারো জন্যই আনন্দদায়ক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি এবার সুন্দরবন ভ্রমণের আয়োজন করেছে। আয়োজনে সঙ্গী হয়ে গেছি আমরা।
অতি উত্সাহী বন্ধু গোলাম রসুল দুইদিন আগে থেকেই সুন্দরবন যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছে। সবার মধ্যেই উত্সবের আমেজ। বাস চলতে শুরু করেছে। রওনা দিলাম বাগেরহাট জেলার মংলা বন্দরের দিকে। বাস দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। বাসের মধ্যেই খাওয়া হলো সকালের নাশতা। নাশতা শেষে সিনিয়র-জুনিয়র সবাই মিলে শুরু হলো নাচ আর গান। এতই মশগুল ছিলাম যে কখন যে মংলায় পৌঁছেছি বুঝতেই পারিনি। আমাদের গন্তব্য সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্র। মংলা থেকে সেখানে যাওয়ার জন্য আগে থেকেই একটি লঞ্চ ভাড়া করা ছিল। লঞ্চে চড়ে আমরা সবাই রওনা হলাম কটকা। এখানে আছে হরিণ, বানর আর নাম না জানা হাজারো পাখি। দলবেঁধে আমরা এগিয়ে চললাম। যতই ভেতরে যাচ্ছিলাম ততই আনন্দ আর ভয়ের অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিল। তবে হাতে থাকা ক্যামেরার সাটার চলছিল সমানে। জুয়েল ভাই নানা প্রজাতির গাছপালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাদের।
এরপর পশুর নদীর বুক চিরে আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। ওপরে মেঘের আস্ফাালন আর নদীতে ঢেউয়ের তেজ। সঙ্গে প্রবল বাতাস। লঞ্চ আসলো নতুন করে নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার ও ফরেস্ট বাংলোর কাছে। জোয়ার ভাটার কারণে বনের কর্দমাক্ত মাটিতে হেঁটে যেতে অনেকেরই খুব কষ্ট হচ্ছিল।
তাছাড়া সুন্দরী গাছের অসংখ্য শাঁসমূল যেন আমাদের পথের কাঁটা হতে এখনো টিকে আছে। কাদার মধ্যেই আমরা দেখলাম বাঘ মামার পায়ের ছাপ। চারদিকের ঘন জঙ্গল আর গাছপালার সারি হঠাত্ই ভয়ের জন্ম দিলো। এরপর আবার বন আর গাছপালার পাঠ চলল কিছুক্ষণ। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত সবাইকে কাদামাখা ভূতের মতো লাগছিল। ফেরার সময় অনেকেই স্মৃতি হিসাবে গোলপাতা গাছের ফল সঙ্গে নিল।
