ঘুড়ি ধরার খেলা

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ১৭:৫৯
পুতুল নাচের পুতুলের মত লেজঅলা ঘুড়িগুলো দুলতে-দুলতে উপরে উঠছে আবার সড়-সড় করে- সুতো গিলতে গিলতে নেচে নেচে নামছে। নীল আকাশ জুড়ে সাদা, সবুজ, লাল, নীল কত রঙের ঘুড়ি। কোনটার লম্বা লেজ, কোনটার লেজ নেই। বড় মাঠটার পাশ দিয়ে নদী এঁকে-বেঁকে বয়ে গেছে দূরে। নদী প্রায় মর-মর। পানি না থাকার লজ্জায় হঠাত্ বেঁকে গাঁয়ের পাশে যেন আড়াল হয়েছে। রঞ্জুর ঘুড়িটা লেজওয়ালা। লম্বা লেজ না লাগালে সে উড়তেই পারে না। যেটুকু উড়ে তাও বেশি আকাশে নয়। পাড়ার বড় বড় ছেলেরা বেশ রোয়াক নিয়ে ঘুড়ি উড়ায়। সাঁই সাঁই করে সুতো ছাড়ে, আবার খিঁচিয়ে সুতো জড়িয়ে নেয়। রঞ্জুর দৌড় বেশি দূরে নয়। বাড়ি থেকে মাঠ হয়ে এই নদীর ধার পর্যন্ত। রঞ্জু এখনও অতবড় হয়নি। শুধু ঘুড়িটা নিয়ে একটু উড়ানোর মতো করে দৌড়, তার পর সুতো গুটাতে গুটাতে ঘুড়িটা যাবো না যাবো না করে, দু’দিকে মাথা না-না করে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। কি আর করা, দৌড়ে এস বুক ধক ধক করে। তখন নাটাই গুটিয়ে নিয়ে ঘুড়িটা ছোটভাই সঞ্জুর হাতে ধরিয়ে দেয়। সঞ্জু বলে- ভাইয়া আমি একটু উড়াই। রঞ্জু ঘাড় কাত করে বলে—উড়াও। সঞ্জু তখন দৌড়াবে না ঘুড়ি সামলাবে বুঝতেই পারে না, কেন না সে এখনও ভালভাবে দৌড়াতে পারে না। পাড়ার বড় ছেলে মধু বলে- কিরে ঘুড়ি উড়াবি না? রঞ্জু মাথা চুলকিয়ে বলে- তোমরাই উড়াও, আমি আর একটু বড় হলে উড়াবো। বড় হবি কিরে! তুই তো বড়ই হয়ে গেছিস, বল যে ঘুড়ি উড়াতে পারিস না। এই বলে মধু হি হি করে হাসে। খুব রাগ হয় রঞ্জুর, কিন্তু কিছু না বলে হা করে ঘাড় বেঁকিয়ে ঘুড়ি কাটা খেলা দেখে। যখন কোন ঘুড়ি কাটা পড়ে, তখন দারুণ মজা হয়। লে-লে, ধর-ধর করে ছোট-বড়, মাঝারি ঘুড়িঅলারা দৌড় দৌড় করে ঝাঁক বেঁধে ছুটতে থাকে। তখন আর কারো নিজের ঘুড়ি নাটাইয়ের খোঁজ থাকে না। নাটাই সুতো ফেড়ে, কাটা ঘুড়ির পেছনে ছুটে চলে। এমনি করে রোজ রোজ ঘুড়ি কাটে আর রোজ রোজ দৌড়; রঞ্জুর দেখতে খুব ভালো লাগে, আবার মনও খারাপ হয়। নিজে যদি ঐ অতদূর দৌড়ে যেতে পারতো, যদি ঘুড়িটা সে ধরে ফেলতে পারতো। সবাই যখন দৌড় দেয় সে ও ধর-ধর করে একঝাঁক ছেলের পিছু পিছু ছুটে যায়। কিন্তু বড় মাঠটার কাছে যেতেই থমকে দাঁড়াতে হয়। অতদূর সে কখনও যায়নি। ভয় ভয় করে। দূর থেকে দেখে, একঝাঁক ছেলে হাসতে-খেলতে, মাথার উপর আকাশ আর কাটা ঘুড়ি নিয়ে দৌড়ে চলেছে। এমনভাবে দৌড়ে যেতে তারও খুব ইচ্ছে করে। বুকের মধ্যে ভারি হয়ে ওঠে। তারপর অনেক পরে যখন সবাই ফিরে আসতে থাকে, তখন খুব মজা। কারো বুক ধক ধক করছে, কারো পায়ে কাঁটা ফুটেছে, কারো পা ছিলে গেছে। কেউ কেউ কচু ডাঁটার রস ছিলে যাওয়া স্থানে টিপে দিচ্ছে- কেউ থুথু লাগাচ্ছে ছেঁড়া চামড়ায়। আবার কেউ ধূলোর মধ্যে পড়ে, ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে কাঁদতে আসছে- কেউ থুথু লাগাচ্ছে ছেঁড়া চামড়ায়। আবার কেউ ধূলোর মধ্যে পড়ে, ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে কাঁদতে আসছে। কারো পায়ে গোবর। কারো লুঙ্গি হয়েছে ফটাশ। কি যে এই মজার ঘুড়ি ধরার খেলা। এত কিছুর পরও সবার মুখে যেন যুদ্ধ জয়ের ঝিলিক। এই ঝিলিকের মজাই রঞ্জুকে টানে। কাটা ঘুড়িটা কে ধরেছে, কে কত সুতো পেয়েছে, কিছুই বুঝতে পারে না। সেই দূরে ঐ মাঠে দৌড়ানোর কি যে সাধ, কি যে মজা, খুঁজে পেতে খুব ইচ্ছে করে। আজও অনেক ঘুড়ি উড়ছে, কাটছে, দৌড়াচ্ছে সবাই, আবার ফিরছে। কোনটা দূরে, কোনটা খুব কাছেই গিয়ে পড়ছে। ঘুড়ি উড়ানোর মতো নীল আকাশ, মৃদু বাতাস। খালিদ রঞ্জুকে বলে-তুই ঘুড়ি ধরতে যাস না কেন? রঞ্জু বলে- আমি অতদূর যেতে পারি না, কিভাবে ধরবো। খালিদ এবার খিঁচিয়ে সুতো টানে। মধু বলে- দেখ খালিদ আমার ঘুড্ডি কিন্তু অনেক উপরে, কাটলে অনেক সুতো যাবে। এবার সত্যি সত্যি মধুর ঘুড়িটা কেটে গেল। শুরু হলো দৌড়। রঞ্জুও প্রতিদিনের মতো দৌড়ে গেল মাঠটার কাছে। যেখানে এসে রোজ সে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু আজ কি জানি এক টান তাকে নিয়ে গেল সবার পিছু পিছু। পেছন থেকে সঞ্জু ডেকে উঠে- ভাইয়া আমিও যাবো। রঞ্জু ধমকে উঠে- তুমি যেও না আমার ঘুড়িটা ধরে রাখো। রঞ্জুর নাটাই ঘুড়ি হাতে সঞ্জু চিন্তিত মুখে তাকিয়ে থাকে। রঞ্জু দৌড়ে দূর মাঠে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। নীল আকাশের শূন্যতা বেয়ে ঘুড়িটা যাবো কি যাবো না, এখানেই নামবো কি দূরে গিয়ে নামবো, এমন করতে করতে নেমে যাচ্ছে দূর গাঁয়ের দিকে। রঞ্জুরা ছুটে চলেছে সামনের মাঠে, এক মাঠ কলাই ক্ষেত আর খেসারি লতায় পা জড়িয়ে-জড়িয়ে যাচ্ছে। কি আনন্দ এই সবুজের কাছে। নরম নরম ছোঁয়া, বুকের মধ্যে কেমন ভালো লাগার অনুভূতি মনটাকে চনমনে করে তুলছে। ডানে-বামে, কোথাও কচি লাউয়ের মাঁচা, ধানের ক্ষেতে বাতাসের ঢেউ, কাওনের ভুঁইয়ে মাথা দোলানোর খেলা; জঙ্গলি পাতায় রঙ্গিন ফুল দুলে-দুলে উঠছে। নতুন নতুন সব দেখা রঞ্জুকে বিহ্বল করে তুলছে। ঘুড়ি ভেসে চলেছে আকাশে। মাঠে একঝাঁক কিশোর, পেছনে রঞ্জুও। সে জানে, সবার সাথে আবার ঠিকই ফিরে যাওয়া যাবে। মাঠের পাশে একটা খালে কিছু ছেলে কানি মাছ ধরছিল; তারাও চমকে উঠে, মাছ ধরা ফেলে ধর ধর করে ছুটে চলে। কারো পায়ে-হাতে, কারো গায়ে কাদা। রঞ্জু দেখলো-বাঁশবাগানের মাথায় আটকে গেছে ঘুড়িটা। যতসব বড় বড় ছেলেরা হৈ-চৈ করে বাঁশ বেয়ে উঠতে লাগলো। বাঁশের কঞ্চির খোঁচা,পাখির পুরাতন বাসা ভেঙ্গে ভেঙ্গে উঠে যাচ্ছে উপরে। একসাথে বাবু, খালিদ, হোসেন, হৈ-চৈ করে উঠে গেল বাঁশের মাথায়। বাঁশগুলো ওদের ভারে দোল খেলে যাচ্ছে। একঝাঁক নাম-না-জানা পাখি হঠাত্ হৈ-চৈ দেখে যেন ভয় পেয়ে গেছে। কিচির-মিচির করে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। ঘুড়িটা হাতের নাগালে আসছে আবার, ধরা দেব না দেব না করে পাক খেয়ে উঠে যাচ্ছে উপরে। শেষে বাতাস না পেয়ে অলসের মত যেমনি ঝুলে গেল, আর অমনি তিন দস্যির থাবায় ঘুড়িটা তিন অংশ হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে তিনজনই খি-খি করে হেসে উঠলো। বাঁশবাগানের নিচে সবার মধ্যে হাসির রোল খেলে গেল। সবাই যেন এমন একটা ঘটনার জন্যই প্রস্তুত ছিল। তারপর আবার দৌড়-দৌড়। আবার সেই মাঠ, কাওনের ক্ষেত, লাউয়ের মাচা, কচি ধানের বাতাস-দোলা মাঠ, খেসারির লতার ঘ্রাণ নিতে নিতে রঞ্জুরা হৈ-চৈ করে ফিরে আসে। রঞ্জুর জন্য অপেক্ষায় ছিল সঞ্জু। তার ফিরে আসা দেখে সঞ্জুর মুখও ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।