শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২১:২৫
উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ থাকে ২০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এর পরিমাণ ৮ থেকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি হওয়া উচিত। যদিও আমাদের দেশে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে এখনো বরাদ্দের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তবে সেটি আড়াই শতাংশেরও কম, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। আর এজন্য আমাদের দেশে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এবং মেধাবী ছেলেমেয়েরা শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, যেটি আমাদের দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি। ইংল্যান্ডের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. পিটার জে এটকিন্স সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরকালে পত্রিকায় এক সাক্ষাত্কারে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে হলে কৃষির উন্নয়ন কিংবা শিল্পায়নের চেয়ে শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসার ঘটানো উচিত। তিনি বলেন, এজন্য শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা দক্ষ জনবল তৈরির প্রধান হাতিয়ার। জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে গড়ে তুললে তারাই নেতৃত্ব দেবে কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে। জনসাধারণ শিক্ষিত হলেই সামাজিক উন্নয়নসূচক তথা অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রভৃতির উন্নয়ন ঘটবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। শিক্ষকেরা জাতি গঠনের কারিগর। আমাদের দেশে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সরকার অনুমোদিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখানেই পড়ালেখা করে। শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন এ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ। এত বড় ভূমিকা পালন করেও এই কারিগরেরা কী পাচ্ছেন তা আমাদের ভেবে দেখা উচিত। ‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার দিল্লিপতি সে কোন ছার/ভয় করি নাকো ধারি নাকো ধার, মনে আছে মোর বল।’ হয়তো দিল্লির প্রেক্ষাপটে এই কবিতা ঠিক। সেখানে শিক্ষকদের যথোপযুক্ত বেতনসহ মর্যাদাও আছে। শিক্ষকদের কোচিং-টিউশনিরও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের মনে কি এ রকম বল আছে? বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যে বেতন কাঠামো তা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে টিউশনি বা কোচিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হচ্ছেন। ২০০৯ সালে যে জাতীয় স্কেল দেওয়া হয়েছিল তাতে একজন বেসরকারি কলেজ-শিক্ষকের বেতন পনেরো হাজার টাকা। ২০০৯ সালে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৩৬০ টাকা, এখন তার দাম ৭০০ টাকা। অথচ ২০০৯ সালের পর থেকে শিক্ষকদের শুধুমাত্র সামান্য ভাতা ছাড়া বেতন এক টাকাও বাড়েনি। একজন কলেজ-শিক্ষককে বাড়িভাড়া বাবদ পাঁচশো টাকা এবং চিকিত্সাভাতা তিনশো টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে পাঁচশো টাকা বাড়িভাড়ায় পরিবার নিয়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। তিনশো টাকা চিকিত্সাভাতায় একজন ডাক্তারের শুধু ফিস ছাড়া আর কিছুই হয় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে চল্লিশ হাজার কোটি টাকা লাগবে। কিন্তু বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যয় হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলে এই খাতে ব্যয়ের দেড় গুণ বা বেশি হলে দ্বিগুণ টাকা লাগতে পারে বলে শিক্ষকেরা মনে করেন। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের সমস্ত রকম আয় সরকারি কোষাগারে জমা নিলে সেখান থেকেও একটি বড় অঙ্কের টাকা আসবে। শিক্ষকেরা আন্দোলন করলেও সরকার শিক্ষকদের এ দাবি আমলে নেয়নি। আমরা সার্কভুক্ত দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে পারি, সেসব দেশে জাতীয়করণ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। তাই সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই— শিক্ষাখাতে আরো বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষার প্রসার ও দক্ষ জনবল গড়ে তুলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়