৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনটির শুরু ১৮৫৭ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি কারখানায় নারী শ্রমিকরা দৈনিক শ্রম ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে আট ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। ১৯০৮ সালে এই আন্দোলন পোশাক ও বস্ত্রশিল্প কারখানার নারী শ্রমিকদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার অধিকার আদায় হয়। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে। এর দুই বছর পর জাতিসংঘ দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকেই প্রতিবছরের জন্য একটা থিম নির্দিষ্ট করে দিনটিকে স্মরণ করা হয়।
কেন দিবসটি পালন করতে একটা থিম বরাদ্দ করা হলো? প্রতিটা বছরের জন্য একটা নিদিষ্ট থিম কি আমাদের কোনো কিছুই ইঙ্গিত করে না? পুরো ইতিহাস দুইটি দিক স্পষ্ট করে। এক: নারীদের আন্দোলন। দুই: নারীর অধিকারের দাবি আদায়। নারীদের সংকটকে সমাধানের আওতায় আনতে বছরের ৩৬৫ দিনকে সামনে রেখে এই দিনটা একটা আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মই বটে। নিজের অধিকার ও দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার, আদায় করার একটা গোছানো কাঠামো পাওয়া যায় এই দিনে। পুরুষ প্রভাবিত এই সমাজে পুরুষ অভিভাবকদের অভিভাবকত্বের ছত্রছায়ায় নারীর অবস্থান কোণঠাসা; তিল পরিমাণ জায়গা নেই নারীর স্বাধীনতার। সেখানে নিজের কথা বলার জন্য পাওয়া ছোট্ট একটু জায়গাকেও যেন আমরা ধ্বংস না করি। জাতিসংঘ প্রতিবছর পুরো বছরটির জন্য নারীদের মোটাদাগে একটা সমস্যাকে চিহ্নিত করে, সেই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের কমিটিগুলোকে কাজ করার আহবান জানায়। অর্থাত্ একটু গভীরে ভাবলে, দিনটা একটা মাত্র দিন, কিন্তু সারা বছরের লক্ষ্যের তাগাদা। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কমিটিগুলো কি সেই লক্ষ্যকে পূরণ করে? আসুন, আমরা সোচ্চার হই। ১৯০৮ সালের নারীরা যেভাবে তাদের অধিকার আদায়ে সক্ষম হয়েছেন, আমরাও তাদের পথে পথ চলি। আসুন, দিনটির প্রকৃত মর্ম বুঝে যথার্থভাবে দিনটিকে নিজের অধিকার-দাবি-স্বাধীনতা প্রাপ্তির একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করি।
২
নারীর অধিকার বাস্তবায়ন ও ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করা দেশের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত ‘মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’। নামটির দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ‘মহিলা’ শব্দটির ব্যবচ্ছেদ করলে দাঁড়ায় ‘মহলে থাকেন যিনি’। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারি মন্ত্রণালয়েই এই অবস্থা! শব্দ চয়নেই যেখানে বৈষম্য সেখানে বৈষম্যের এই সমাজ থেকে ‘অধিকার-আদায়’ যেন নাটক-সিনেমার চিত্রনাট্যই বটে!
প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অধিকার আদায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতিহারে নিয়মিত অঙ্গীকার হিসেবে বরাদ্দ থাকে। নির্ধারিত মেয়াদ ৫ বছর এবং এই ৫ বছরের জন্য বরাদ্দ করা এই লক্ষ্যে থাকে নারীর সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং সামগ্রিক উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি; যেমন: নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন বন্ধ, নারী পাচার রোধ, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা বিধান এবং আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় পূর্ণ ও সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ নারীর সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু হায়! এ যেন বাজারের বর্ণিল পণ্যের মনোহারি বিজ্ঞাপন, ভেতরটা শুধুই অন্তঃসারশূন্য। ১৮৫৭ সালে ৮ ঘণ্টার শ্রম-সংক্রান্ত নারীদের দাবি পূরণ হতে সময় লাগে ৫১ বছর, সেখানে ৫ বছরের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের এত বিশাল পরিকল্পনা আদৌ কি পূরণযোগ্য পরিকল্পনা? নাকি এটাও নারী ভোটারদেরকে নিজেদের দলে ভিড়ানোর এক সস্তা রাজনীতি? দেশের উন্নয়নে নিয়োজিত রাজনৈতিক দলগুলো নারী উন্নয়নকে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন না, দেখেন একটা রুটিন হিসেবে, ভোট প্রাপ্তির এক কৌশল হিসেবে।
৩
দেশের নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিগুলো দেশি ও বিদেশি ফান্ডের দেওয়া প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন করে। বৈদেশিক ডোনারের সহযোগিতামূলক অর্থে এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ছত্রছায়ার এই প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর ক্ষমতায়নকে বাণিজ্য করার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করে। এখানে কর্মরতরা বেতনভুক্ত কর্মচারী মাত্র। নারীর প্রতি বৈষম্য, অবিচার, মোটাদাগে নারী অধিকার আদায় এগুলো তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাবনার বিষয়; ‘সামাজিক আন্দোলন’-কে বিনিয়োগ করে ‘নারী’-কে পুঁজি হিসেবে বাজারে চালান করে পুরুষতন্ত্রের এই সমাজে পুরুষকে না খেপিয়ে নিজেদের আধিপত্য একটু একটু করে বিস্তার করে চলেন।
আধুনিকতার অগ্রগতির এই যুগেও ডাক্তার সাজিয়া আফরিনদের নিজের কর্মক্ষেত্রে সম্মানহানি ঘটে, তখন কোনো নারীসংগঠনের টিকি দেখা যায় না! নারী-শরীর প্রদর্শন করা প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড নিয়ে কোনো নারীনেত্রী মাঠে নামেন না! তারা শুধু সভা করেন, সেমিনার করেন, গোলটেবিল বৈঠক করেন, মানববন্ধন করেন, ‘করতে হবে’ ‘করতে হবে’ বলে মুখে ফেনা তোলেন, তারিখ দিয়ে রুটিন করেন। কিন্তু এর ফল দাঁড়ায় প্রকল্প শেষে একটা লাভজনক অর্থপ্রাপ্তি! নারী ক্ষমতায়ন যেন এক সুনির্দিষ্ট সুসজ্জিত বাণিজ্য-সংস্কৃতি; এটা একই প্রেক্ষাপটে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আঙ্গিকে বিস্তার লাভ করছে।
৪
প্রতিটা সংবাদপত্রে সাপ্তাহিকভাবে ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে প্রতি সপ্তাহের জন্য এই ক্রোড়পত্রগুলো হয় খেলা নিয়ে, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে, লাইফ-স্টাইল সংক্রান্ত, স্বাস্থ্যবিষয়ক, শিশুদের জন্য প্রভৃতি। এগুলোর সঙ্গেই সপ্তাহের একটা দিন নারী-বিষয়ক ক্রোড়পত্রও থাকে। উইকিপিডিয়া থেকে জানা গেলো, সংবাদপত্রের ক্রোড়পত্রের ভূমিকা গৌণ। এখানে সাধারণত পূর্বের বা অতীত ঘটনাগুলো স্থান পায়। পূর্বের ঘটনাগুলোকেই বর্তমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে নির্দিষ্ট একটা বিষয়ের ওপর কাভারেজ দেওয়া হয়। এগুলো সাধারণত বিস্তৃত পরিসরে লেখা সময় নিরপেক্ষ এবং অসমালোচনাত্মক হয়। নারীকে নিয়ে সংবাদপত্রের এই অবস্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, পুরুষের এই সমাজে নারীরা কতটা গৌণ! গড়পরতা প্রতিটা নারী বিষয়ক ক্রোড়পত্রেই থাকে কোনো নারীর সাফল্যগাথা, নয়তো অ্যাসিডে আক্রান্ত কোনো নারীর জবানবন্দি অথবা ধর্ষণ-সংবাদের ফলো-আপ, নয়তো পুরুষের দৃষ্টিতে কেমন বউ চাই প্রভৃতি। কখনো আবার থাকে নতুন সংসারে নারীর ভূমিকা, শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক, কখনো বিয়ের আয়োজন, কখনো স্বামী-স্ত্রীর মতবিরোধ প্রভৃতি। এই হলো সংবাদপত্রে সাপ্তাহিকভাবে প্রকাশিত নারী-বিষয়ক ক্রোড়পত্রের বিষয়বস্তু! আর প্রতিদিনকার সংবাদপত্রেও নারীদের দেখা যায়; তবে সেটা রঙিন রঙিন বিজ্ঞাপনে!
একটি জাতীয় দৈনিকের নারী বিষয়ক পাতার ইন-চার্জ একবার বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, সামাজিক অনেক বিষয়ই সংবাদপত্রের মূল পৃষ্ঠাগুলোতে স্থান পায় না। এবং এজন্যই একটা বিশেষ পৃষ্ঠার প্রয়োজন পড়ে। যদি নারী-বিষয়ক কোনো পৃষ্ঠা না থাকতো তাহলো নারী বিষয়ক অনেক সংবাদই অপ্রকাশিত থেকে যেতো।’ নারী-বিষয়ক এই পৃষ্ঠায় রিপোর্টগুলো নীতিবাক্য ও অনুশাসনকে ‘জার্নালিস্টিকভাবে’ উপস্থাপন করা হয় বলে তিনি জানান।
এখানেই আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই সংকটটা ধরেই এটাকে নিজের অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম তৈরি করে নিতে হবে। সংবাদপত্রে নিজেদের জন্য পাওয়া জায়গাটিকে নারী কণ্ঠস্বর বানাতে হবে। প্রতিবছর জাতিসংঘের দেওয়া থিম অনুযায়ী দেশের কোথায় কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে— তার তথ্য জানতে হবে। এবং উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংবাদপত্র থেকে আহবান জানাতে হবে।
সমাজ তার সংকীর্ণ ক্ষেত্রে নারীর অবাধ বিচরণ রেখে আর অধিকারকে আইনের আওতায় এনে নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে নারীকে শাসন করার এক গোলকধাঁধাময় কৌশল কায়েম করে রেখেছে। আদি থেকেই এটা হয়ে আসছে। মৌলিক অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করা, সহিংসতাকে নিত্য ঘটনায় পরিণত করা, মানুষ হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে নারীকে তার প্রকৃত ক্ষমতা উপলব্ধি করা থেকে দূরে রেখে তাকে অধস্তন করেছে এই সমাজ। জনপ্রিয় সংস্কৃতি-সাহিত্য-শিল্পে নারী সৌন্দর্যের চর্চা, নারীর মাতৃত্ব, নারীর কমনীয়তার বলয়ে সমাজ নারী শোষণের এক সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করে রেখেছে। সমাজের এই পাতা ফাঁদগুলো বুঝে নিয়ে, ফাঁদের পাশে আল বের করে হাঁটতে শিখতে হবে। হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া মানে জীবনব্যাপী পরাধীনতার শেকলে বন্দিত্ব গ্রহণ করা— এটা ভুলে গেলে চলবে না।
ঢাকা
