আল্টিমেটাম অনুযায়ী জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু না হলে বৃহত্তর আন্দোলন-কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তার মোড়ে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশে মঞ্চের নেতারা এ ঘোষণা দেন।
পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের পক্ষে গণজাগরণ মুখপাত্র ব্লগার ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, আগামী ২৬ মার্চের ভেতর জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। আজকের এ সমাবেশে আমাদের মূল কথা আপনারা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন একাত্তরের ঘৃণ্য জামায়াতকে ঘৃণা করে যাবেন। ইমরান বলেন, দীর্ঘ এক মাস ধরে আমরা আন্দোলন করছি। বাংলাদেশে অহিংস আন্দোলনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানে বাসে আগুন দেয়া নয়, কারো বাড়িতে আগুন দেয়া নয়, মানুষ মেরে ফেলা নয়। আপনারা যারা মুসলমান তারা হিন্দুদের মন্দির পাহারা দেবেন। যারা হিন্দু তারা মুসলমানদের মসজিদ পাহারা দিবেন। যাতে জামায়াত শিবির কোন ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চালাতে না পারে।
ডা. ইমরান বলেন,‘ দীর্ঘ এক মাস ধরে আন্দোলনে আমাদের কয়েকজন আন্দোলনকারী শহীদ হয়েছেন। জামায়াত শিবিরের তান্ডবে আমাদের অনেক পুলিশ ভাই শহীদ হয়েছেন। অনেক সংগঠককে জামায়াত শিবির চক্র হুমকিতে রেখেছে। আমরা শহীদদের উত্তরসূরি, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না। আশা করি সরকার অতি শিগগির এই জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করবে’। তিনি বলেন ‘আমাদের কোন ব্যক্তি, রাজনৈতিক সংগঠনসহ কারো প্রতি বিদ্বেষ নেই। আমরা শুধু চাই যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং রাজাকার জামায়াত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক। তাই আমাদের সবাইকে এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কোন জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করা যাবে না।’
তিনি আরো বলেন, কয়েকটি গণমাধ্যম জামায়াত-শিবিরকে সাহায্য করছে। এইসব গণমাধ্যম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করছে। আর এই জামায়াত শিবির একাত্তরের পরবর্তী সময়ে যখনই অস্তিত্ব সংকটে পরত তখনই ধর্মের লেবাস লাগিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করত। এবারও তারা এই পথে হাঁটছে।
সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির, সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এস এম শুভ, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু, সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুসমত, ছাত্র ঐক্য ফোরামের আহবায়ক সোহান সোবহান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মেহেদী হাসান তমাল, সাধারণ সম্পাদক সাইফুজ্জামান সাকন প্রমুখ। সমাবেশে ঢাকা- ৫ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা, ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সনজীদা খানম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. আওলাদ হোসেন, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশ পরিচালনা করেন খান আসাদুজ্জামান মাসুম ও ড. রশিদুল হাসান।
সমাবেশে সংহতি জানাতে এসে আল্লামা কে এম শফিউল ইসলাম মুজাদ্দেদী বলেন, জামায়াতকে বিভিন্ন ওলামা মাশায়েখ কাফের ঘোষণা করেছেন। জামায়াত শিবির ইসলামী দল হতে পারে না। তাদেরকে যারা সাহায্য করছেন তারা ঈমানদারি নয়। জামায়াত শিবিরের সাথে আত্মীয়তা করা হারাম, বন্ধুতা করা হারাম। তার কথার সাথে সমর্থন জানিয়ে উপস্থিত জনতা দুই হাত উপরে তোলেন।
ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, তিনদিনের হরতালে জামায়াত শিবির মানুষ হত্যা করেছে, ঘর-বাড়ি পুড়িয়েছে, মন্দিরে আগুন দিয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উসকানিদাতা জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ কতে হবে। আমরা অহিংস আন্দোলন করছি আর ওরা সহিংস কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দেশব্যাপী।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম অভিযোগ করেন, অতীতে যারা যুদ্ধাপরাধীদের গোপনে সাহায্য করেছিল, তারা আজ প্রকাশ্যে তাদের সাহায্য করছে। আমরা আশা করেছিলাম, বিরোধী দলীয় নেত্রী শাহবাগে আসবেন। কিন্তু তিনি আসেননি। দেশে ধর্মীয় দাঙ্গা বাধাতে ব্লগার রাজীব হায়দারকে নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। খালেদা জিয়া সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে বলেছেন। তিনি যদি দেশে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা নাই চান, তবে নাটোরের যুবদল নেতা-কর্মীরা সংখ্যালঘুদের বাড়ি এবং মন্দিরে আগুন দিল কেন? আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এসএম শুভ বলেন, এই একাত্তরের ঘৃণ্যরা দেশব্যাপী যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে তার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। অবিলম্বে জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে হবে।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি আব্দুর রউফ বলেন, আমাদের লড়াই এখানেই থেমে থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও শোষণ মুক্তির জন্য লড়াই চলবে। আমাদের আল্টিমেটাম অনুযায়ী ২৫ মার্চের ভেতর জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক, তানভীর রুসমত বলেন, আমরা কোন হঠকারিতা বুঝি না হঠকারিতা করি না। সবযুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং জামায়াত শিবির নিষিদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশকে নতুন করে সাজাব আমরা তরুণ সমাজ।
শাহবাগের চলমান গণআন্দোলনের অংশ হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি সমাবেশ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জাগরণ সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। শাহবাগের বাইরে এর আগে রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মতিঝিল, মিরপুর ও বাহাদুর শাহ পার্কে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যাত্রাবাড়ীর গতকালের সমাবেশ শাহবাগের বাইরে গণজাগরণ মঞ্চের পঞ্চম সমাবেশ। যাত্রাবাড়ীর সমাবেশ থেকে ৭ মার্চের সমাবেশে ও ৮ মার্চের নারী জাগরণ সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে সর্বস্তরের জনগণকে আহবান জানানো হয়।
সমাবেশ শেষে গণজাগরণ মঞ্চে আন্দোলনরতরা আবারো শাহবাগে ফিরে যান। ছয় দফা দাবিতে তারা শ্লোগান-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন।
