মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা ভাংচুর লুটপাট আগুন

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২২:২৭
দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির হরতাল চলাকালে গতকাল মঙ্গলবার সকালে খুলনার কয়রা উপজেলায় অন্তত দশটি হিন্দু বাড়িতে ও স্থানীয় বাজারে হামলা চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। তারা নির্বিচারে বাড়ি ও দোকানপাট ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, নোয়াখালীর চাটখীল, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়াসহ একাধিক স্থানে মন্দিরে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। নাটোরের সিংড়ায় হরি মন্দিরের প্রতিমা ভাংচুর করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে সংখ্যালঘু লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়রায় ১০ বাড়িতে হামলা, আগুন কয়রা সংবাদদাতার বরাত দিয়ে খুলনা অফিস জানায়, হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের হিন্দুধর্মাবলম্বী রজক (ধোপা) পাড়ার দশটি বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি লুটপাট চালানো হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় আমাদী বাজারের ২০টিরও বেশি দোকানপাট ভাংচুর করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা । প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার হরতাল সমর্থকরা মিছিল নিয়ে স্থানীয় চাঁদালী সেতুর কাছে জড়ো হয়। পরে কয়েকশ’ লোক আমাদী বাজারে গিয়ে নির্বিচারে দোকানে ভাংচুর শুরু করে। এ সময় প্রায় ২০টিরও বেশি দোকান ভাংচুর ও উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমানের মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। পর বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে হামলাকারীদের প্রতিরোধ করে। এ সময় হরতাল সমর্থকরা পিছু হটে বাজারের পাশে হিন্দুধর্মাবলম্বী রজকপাড়ায় ঢুকে অমিয় দাস, অপূর্ব দাস, সুবোধ দাস, কার্তিক দাস ও সোনা দাসের পূজার ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ওই সময় হামলাকারীরা বাড়িঘরে থাকা বিভিন্ন বয়সী নারীদের মারধর করে যে যার মত মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায়। এ সময় এলাকার লোকজন হামলাকারী আবু সাঈদ (২২) ও লিটন গাজীকে (১৮) আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর খায়রুল কবির বলেন, আগুনে দুইটি বসত ঘর, দুইটি রান্নাঘর ও একটি পূজার ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তবে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হবে বলে তিনি জানান। হাজীগঞ্জে মন্দির ভেঙ্গে পুকুরে :হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার ৬নং বড়কুল পূর্ব ইউনিয়নের দক্ষিণ রায়চোঁ গ্রামের মালি বাড়ীর মহাদেব মন্দির ভাংচুর করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। মন্দিরের পরিচালক দীনিস চন্দএমরান হোসেন ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মন্দির ঘরটি পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, এটি একটি জঘন্য কাজ, যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) জানান, অচিরেই জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে। চাটখিলে মন্দিরে অগ্নিসংযোগ :নোয়াখালী থেকে চাটখিল সংবাদদাতা জানান, উপজেলার পশ্চিম করটখিল গ্রামের চিন্তাহরণ দেবনাথের বাড়িতে ১০০ বছরের পুরোনো সনাতন হরিসভা মন্দিরে সোমবার গভীর রাতে অজ্ঞাত দুস্কৃতিকারীরা অগ্নিসংযোগ করে। আগুনে একটি ঢোলসহ পূজার সামগ্রী ও সরঞ্জামাদি পুড়ে গেছে। রাত ১টার দিকে মন্দিরের জানালার ফাঁক দিয়ে কাগজে দাহ্য পদার্থ মিশিয়ে তাতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এসময় মন্দিরের ভিতরে রক্ষিত ঢোল পুড়ে গিয়ে বিকট শব্দ হয়। শব্দ শুনে বাড়ি ও আশেপাশের লোকজন এসে আগুন নেভায়। এদিকে মন্দিরে আগুন দেয়ার ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার পর পুলিশ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ চাহেল তস্তুরী জানান, বিষয়টির প্রতি উপজেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি রয়েছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান। সিংড়ায় প্রতিমা ভাংচুর :সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার সোয়াইর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের হরি মন্দিরের প্রতিমা ভাংচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার গভীর রাতে তারা মন্দিরের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে এবং ৩টি প্রতিমা ভাংচুর করে। পরে ওই গ্রামের হিন্দু পাড়ার ১টি খড়ের পালায় আগুন ধরিয়ে দেয়। বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান সিংড়া থানার ওসি এএইচএম ফয়জুর রহমান। হিন্দু-বৌদ্ধ-খিস্ট্রান পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। কোটালীপাড়ায় মন্দিরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত শুরু : কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার লাখিরপাড় সাতকান্দি সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পিছনের ‘ভেনটিলেটর’ দিয়ে কেউ আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর ওই গ্রামের সবুজ বাড়ৈ আগুন দেখে চিত্কার করলে স্থানীয়রা এসে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। আগুনে দুর্গা মূর্তিটি পুড়ে ভেঙ্গে যায়। খবর পেয়ে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমানসহ পুলিশ ও প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যা প্রদীপ দেয়ার সময় অসাবধানতাবশত এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ বিশ্বাস। উজিরপুরের কালি মন্দিরে আগুন :বানারীপাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার শতবছরের ঐতিহ্যবাহী গুঠিয়ার মালাকার বাড়ি কালি মন্দিরে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করেছে। সোমবার গভীর রাতে এ ঘটনায় মন্দিরের একাংশ পুড়ে যায়। এ ঘটনায় সংখ্যালঘু ও এলাকাবাসীর মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হরতালের আগের রাতে এলাকায় ভীতি ছড়ানোর জন্য বিএনপি ও জামায়াত-শিবির চক্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সকালে জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) অশোক কুমার নন্দী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এদিকে মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুল ইসলাম মনিসহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব ও রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। সাদুল্লাপুরে মন্দির আগুন দেয়ার চেষ্টা :গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, সাদুল্লাপুর উপজেলার পূর্ব দামোদরপুর গ্রামের দেবেন্দ নাথের বাড়ীর মন্দিরে সোমবার রাত ১০টার দিকে আগুন দেয়া হয়। টের পেয়ে স্থানীয় জনগণ আগুন নেভায়। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা এ কাজ করেছে বলে জানান সাদুল্লাপুর থানার ওসি মজনুর রহমান। শৈলকুপায় সংখ্যালঘুর বাড়িতে ককটেল : ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, সোমবার রাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কবিরপুরে সংখ্যালঘু পাড়ায় সুনিল কর্মকারের বাড়িতে তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে সন্ত্রাসীরা। বিকট শব্দে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। রামগতির হিন্দুপল্লীতে রাত জেগে পাহারা :রামগতি (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার বিভিন্ন হিন্দুপল্লীতে হামলা আতংক বিরাজ করছে। বিশেষ করে রামগতি পৌরসভার চরসীতা, চর ডাক্তার, চরসেকান্দর এবং চরগাজী ইউনিয়নের টুমচর, চরলক্ষ্মী ও বড়খেরী ইউনিয়নের হিন্দু পরিবারগুলো চরম আতংকের মধ্যে রয়েছেন। এসব এলাকার অনেক পরিবারের নারী ও শিশুরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। এলাকার মন্দিরগুলোতে এবং পাড়ায় পাড়ায় রাতে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।