আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা অবিস্মরণীয় একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক উত্তাল জনসমুদ্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’—বঙ্গবন্ধুর এই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণাই ছিলো প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি। বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক রেসকোর্সে এ ভাষণ যখন দিচ্ছিলেন ঠিক ওইদিনই ঢাকায় এসে পৌঁছান জেনারেল টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলী। এই একটি ভাষণেই নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধু। ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিত পল্টনের জনসমাবেশে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ৬ মার্চের মধ্যে যদি সরকার তার অবস্থান পরিবর্তন না করে তাহলে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ঘোষণা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক সেই ৭ই মার্চের জনসভা। গত ৪/৫ দিনের ঘটনাবলীতে বিক্ষুব্ধ মানুষ নতুন কর্মসূচির অপেক্ষায় ছিলেন। সকাল থেকেই চারদিক থেকে মানুষের ঢল নামে রেসকোর্স ময়দানে। ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’, শ্লোগানে মুখরিত হয় রেসকোর্স ময়দান।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ২২ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, .... ‘এরপর যদি একটি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়-তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। ....আমি যদি তোমাদের হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা সব বন্ধ করে দেবে। .... রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
আজ থেকে ৪২ বছর আগে অগ্নিঝরা একাত্তরের এইদিনে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন একমাত্র বক্তা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পূর্বে আ স ম আব্দুর রব, নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মঞ্চ থেকে মাইকে নানা ধরনের শ্লোগান দিয়ে উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত রাখেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের পরই বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, দুঃসাহসিকতা, আর আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি অর্জন করে নিজস্ব মানচিত্র, লাল-সবুজের পতাকা। তাই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় গৌরবের দিন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাত্পর্য তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১ সালে এ দিনে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে বলিষ্ঠ কণ্ঠে যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন তা এদেশের জনগণকে বিপুল শক্তি ও সাহস যোগায় এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। এই ভাষণের ধারাবাহিকতায় ২৬ মার্চ ১৯৭১ জাতির পিতা ঘোষণা করেন মহান স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের প্রেরণার চিরন্তন উত্স হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বলেন, বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ডাক দেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলার গণমানুষের প্রাণের দাবি ধ্বনিত হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করলে, জাতির পিতা ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও বহু ত্যাগের মধ্যদিয়ে আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করি।
কর্মসূচি : ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ভোর সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল সাতটায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জমায়েত ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং বিকাল সাড়ে তিনটায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
