মিতা হক (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করে চাকরি করছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। তার কাজ দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খুশি। কাজের চাপে তেমন একটা ছুটি-ছাটাও নেয়া হয় না। তবে সম্প্রতি ব্যাংকের কাছে মাতৃত্বকালীন ৬ মাস ছুটি চেয়ে আবেদন করেছেন। কিন্তু ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তাকে ব্যাংকের জারি করা অভ্যন্তরীণ একটি প্রজ্ঞাপন ধরিয়ে দিয়েছে। যেখানে ১শ ১২ দিনের বেশি ছুটি দেয়ার কোন বিধান নেই বলে বলা হয়েছে। ফলে তিনি চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ করে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নাসিমা আক্তার (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ছয় মাসের জন্য ছুটি চেয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চার মাসের অনুমোদন দিয়েছিল। চাকরি হারানোর ভয়ে আমিও আর উচ্চবাচ্য করিনি। সে ছুটি শেষ হওয়ায় দুর্বল শরীর নিয়েও অফিস করছি। তবে এত কম বয়সের সন্তানকে বাড়িতে রেখে আসতে হচ্ছে বলে মনটা খুব খারাপ থাকে। কিন্তু ব্যাপারটা কাউকে বুঝতে না দিয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছি। অতশী মৈত্রেয় (ছদ্মনাম) গত তিন বছর ধরে অন্য আরেকটি ব্যাংকে কর্মরত। প্রথম সন্তানের জন্ম উপলক্ষে কর্তৃপক্ষের কাছে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করে পেয়েছেন চার মাস। পরে আরো বাড়ানোর জন্য আবেদন করেও পাননি। বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরত নারীদের অনেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি না পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। আবার যাদের চাকরির বয়স দুই বছর কম ছুটি চাইলে তাদেরও নানা হয়রানি পোহাতে হচ্ছে। অন্য ব্যাংক ছয় মাস ছুটি কার্যকর করেনি; তবে আমরা কেন করব এমন অজুহাতেও বেশ কয়েকটি ব্যাংক ছয় মাস ছুটি কার্যকর করছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি কর্মজীবী নারীরা আগে মাতৃত্বকালীন ছুটি পেতেন চার মাস। গত বছরের ১৮ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে প্রবিধি অনুবিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, নারীরা ওই বছরের ৯ জানুয়ারি থেকে ছয় মাস ছুটি পাবেন। পরে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকও সকল ব্যাংকের কাছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশে কার্যরত ২৩টি ব্যাংক এখন পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস কার্যকর করেনি।
ব্যাংকের নারী কর্মকর্তারা বলছেন, যেখানে বিশ্বব্যাপী শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ ও এ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং শিশুর জন্মের প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোন কিছু না খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, সেখানে ব্যাংকগুলো ৪ মাসের বেশি ছুটি দিতে রাজি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে পরামর্শ না দিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করলে ব্যাংকগুলো তা মানতে বাধ্য হতো। এসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান, এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল আমিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে আদেশ বলে আমাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস দিতে পরামর্শ দিয়েছিল তা ছিল শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য। সেটা কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজ্য নয়। আমরা তা লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছি। অনেক ব্যাংক ৬ মাস ছুটি দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ব্যাংকের চাকরিতে একজনকে ছয় মাসের জন্য ছুটি দেয়া কঠিন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা বলেন, ব্যাংকগুলো যাতে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয় সেজন্য ব্যাংকার্স সভাসহ বিভিন্ন সময় তাদের প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে। ছুটি দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে ইতিবাচক হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
