পদ্মা সেতু প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে চলতি অর্থবছরের (২০১২-২০১৩) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংশোধন করা হচ্ছে। ৫৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি’র মধ্যে সরকারি বরাদ্দ রয়েছে ৩৩ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে পদ্মা সেতুর জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ৮০৪ কোটি টাকা।বিগত কয়েকটি অর্থবছরে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এডিপি সংশোধনের কাজ শেষ করা হলেও চলতি অর্থবছরে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়াই সরকারের বর্তমান মেয়াদে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু নির্মাণের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রয়োজন ছিলো ৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের যে কয়েকমাস বাকী রয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ প্রয়োজন হবে ১ হাজার থেকে ১২শ’ কোটি টাকা। এ পরিমাণ অর্থ চলতি বাজেট থেকেই বরাদ্দ দেয়া সম্ভব। তাই সরকারের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরে পদ্মা সেতুর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়ে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) শীগগিরই চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে। এর ফলে অন্যান্য বরাদ্দের উপর চাপ সৃষ্টি হবে না। সবমিলিয়ে চলতি অর্থবছরের আরএডিপি’র আকার হচ্ছে ৫০ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। অর্থাত্ পদ্মা সেতু প্রকল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার পরেও এ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ থেকে সাড়ে আট শতাংশ বা ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রণালয় থেকে সমপ্রতি এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সংশোধিত এ বরাদ্দের উপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বরাদ্দের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে পদ্মা সেতু বিষয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে স্থানে পৌঁছেছে তাতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ মোটেই অসুবিধাজনক নয়। আগামী চার বছরে আমাদের বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে খরচ করা হবে। সেজন্য সময়সূচি ও বার্ষিক হিসাব শিগগিরই সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের লক্ষ্য থাকলেও পরবর্তীতে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করা হবে। ইতিমধ্যে ভারত থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার (১৬শ’ কোটি টাকা) পাওয়া গেছে। এরকম আরো অর্থায়ন যেমন মালয়েশিয়া থেকে হয়তো আগামীতে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে পাঁচ কিলোমিটারের বেশী দীর্ঘ এ সেতু প্রকল্পে ইতিমধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে বাংলাদেশ সরকার। অন্যদিকে দেশীয় অর্থায়নে সেতু নির্মাণের কিছু প্রারম্ভিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সেতু বিভাগ। প্রথমে মূল সেতু ও নদী শাসনের দরপত্রের কার্যক্রম শুরু হবে। ঠিকাদারদের যে চিঠি দেয়ার প্রস্তুতি চলছে তাতে দেশীয় অর্থায়নের বিষয়টি উল্লেখ থাকবে বলে জানা যায়।
এদিকে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ পদ্মা সেতু প্রকল্পে চূড়ান্ত শর্তগুলো নিয়ে একমত হয়ে একটি প্রাথমিকভাবে সমঝোতায় পৌঁছেছে। ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে সেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মালয়েশিয়ার বিশেষ দূত দাতুক সেরী এস স্যামি ভেল্যু গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বার্নামাকে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ সেতু বিভাগ কর্তৃপক্ষের সাথে দুই দিন ফলপ্রসূ বৈঠক শেষে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, মালয়েশিয়া সরকার আশা করছে বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। দুই দেশের সরকারের মধ্যে জি টু জি পদ্ধতিতে চুক্তি হবে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং মালয়েশিয়ার সরকার কর্তৃক নিযুক্ত কনসোর্টিয়ামের মধ্যে অচিরেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এ বিষয়ে, গত ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মালয়েশিয়া প্রতিনিধি দল এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ একটি যৌথ কার্যবিবরণী পত্রতে স্বাক্ষর করেন।
