তাঁর অনবদ্য ভাস্কর্য ‘দ্য ক্রিয়েশান অব অ্যাডাম’ বা’ ডেভিড’কে ঘিরে আজ পর্যন্ত যত উচ্চরোল ও জয়বাদ্য, সেটা বোধহয় পৃথিবীর কম শিল্পী-ভাস্করের বেলায় ঘটেছে। কিন্তু তাঁর জীবনটা ছিল ঠিক এর বিপরীত—নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি ছিলেন ভীষণ সংশয়াচ্ছন্ন। নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে রাখতেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন। অন্যরা যখন তাঁর প্রশস্তি গাইছেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত নিভৃতিতে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন আর একাগ্র নিবিষ্টতায় হাঁটতেন শিল্পের ভুবনে।
‘মিকেলাঞ্জেলোরও প্রায় গোটা জীবনটাই কেটেছে ট্র্যাজিক ধ্বংসের ভেতর দিয়ে। জীবনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়গুলোতেও তিনি ছিলেন মূলত একা।’ যেমনটি বলেছেন শিল্পবোদ্ধা বার্নাড বেরেনসন।
একজন মানুষ জীবনে ক্রমাগত যতই সার্থক, ততটাই তিনি ছিন্নভিন্ন। তাঁকে সম্পূর্ণ জানতে গেলে আমাদের জানতে বাধ্য হতে হয় এই নির্মম সত্য সংবাদ যে, ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নৈরাশ্যের বিষে যতখানি নীল করে দিয়েছে তাঁর জীবন, এমন আর কোনো শিল্পীর বেলায় হয়নি। ওই সময়ের ব্যক্তিগত সংকটকালে একমাত্র ঈশ্বরই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর নিকটতম আত্মীয়। লিখেছেন কবিতা বা সনেটগুচ্ছ।
ইংরেজি ভাষায় তাঁর অনূদিত কবিতার বই একটিই। ‘কমপ্লিট পোয়েমস অ্যান্ড সিলেক্টেড লেটার্স অব মিকেলাঞ্জেলো।’ অনুবাদক—ক্রেঘটন গিলবার্ট, সম্পাদক—রবার্ট এন লিনসকার্ট। বইটিতে মিকেলাঞ্জেলোর কবিতাসংখ্যা তিনশ সাতাশ।
এত বড়মাপের শিল্পী হয়েও নিজের শিল্পকাজ নিয়ে তিনি সকল সময় ছিলেন সংশয়াচ্ছন্ন, কবিতার বেলাতেও তাঁর অক্ষমতা ও সচেতনতার কথা জানিয়ে বন্ধু লুইজি দে রিচ্চিওকে একাধিক চিঠি লিখেছেন। বন্ধুকে অনুরোধ করেছেন নিজের কবিতা শুধরে দেওয়ার। লুইজিকে লিখেছেন—‘ যদি ঠিকমতো নির্ভুল লিখতে না পারি, যেমন লেখা উচিত, যদি ক্রিয়ার ব্যাপারে বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে ফেলি, ক্ষমা করবেন অনুগ্রহ করে।’
আবার লিখেছেন—‘অবাক হবেন না, যদি আপনারা যেভাবে বুঝবেন সেভাবে লিখতে না পারি, কারণ মাথা ঠিক নেই আমার...।’
রবীন্দ্রনাথের পূজার গান আর প্রেমের গানে ঈশ্বর আর নারী একে অপরের প্রক্সি দিয়ে যায় অবিরত, মিকেলাঞ্জেলোর উচ্চারণেও পেয়ে যাই একই অনুরণন। যখন মিকেলাঞ্জেলো ঈশ্বরকে বলছেন—‘Adding to life with added injury...’, মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথকে—‘আরো আরো, প্রভু আরো আরো/ এমনি করে আমায় মারো।’
আবার মিকেলাঞ্জেলো যখন বলেন মানুষের পিঠে ঊর্ধ্বাচারী ডানা থাকা না থাকার কথা—‘Have no wings else earth for a heavenly journey...’, রবীন্দ্রনাথের লেখায় সুদূরের পিয়াসী এক সত্তার আততি। কিংবা মিকেলাঞ্জেলোয় যখন পড়ছি—‘My prayers to you would be a joy indeed, if, for my praying, you would give me strength.’ রবীন্দ্রনাথের আর্তি ঈশ্বরের কাছে— ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা...’
প্রিয় পাঠক, এ এমন নয় যে, শতাব্দীর দুই প্রান্তের দুজন সৃষ্টিকাজের মানুষের কাজকে অংকের হিসেবে মেলানো। এ নিছকই এক লহমা ঝিলিক দিয়ে মিলিয়ে যাওয়া। এক কবির গান অন্য কবির আবহে—এর বেশি কিছু নয়।
১৫০৮ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তাঁর বিখ্যাত সিসতিন চ্যাপেলের সিলিংয়ের কাজ শুরু করলেন। বয়স তখন তেত্রিশ। তাঁর সাঁইত্রিশ যখন, সম্পন্ন করলেন পৃথিবীর বিখ্যাত সিসতিন চ্যাপেলের সিলিংয়ের কাজ। তিনি বেঁচে ছিলেন ঊননব্বই বছর বয়স পর্যন্ত। ১৫০০-য় তিনি যখন কবিতা লিখতে শুরু করেন, তাঁর বয়স তখন পঁচিশ। তত দিনে রোমে নির্মিত হয়ে গেছে ‘পিয়েতা’। এর অল্প পরে হাত লাগাবেন তাঁর বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘ডেভিড’-এ। পিয়েতার জন্য স্ত্রেজ্জি লিখলেন একটা কবিতা—‘সুষমা আর অপরূপতা/ আর শোক আর করুণা, পাথরে প্রাণময়।/ যতটা জোরে কেঁদে থাকো, কেঁদো না,/ সময়ের আগেই জেগে উঠবেন মৃত্যু থেকে
তাঁর অজ্ঞতাসরেই, আমাদের প্রভু/ তোমার পতি, পুত্র, পিতা/ ও কুমারী, জায়া, জননী, ভগ্নি।’
এখানে মিকেলাঞ্জেলোর একটা সনেট দিয়ে লেখা শেষ করব। সনেট নম্বর ৪ (১৫০৭ বা ’০৮—এই সময়ে লিখেছিলেন)—আশ্চর্য পুলক জাগে, শিরোভূষণের/ মালাটি যখন তার সোনালি চুলের/ গায়ে আঁটা, কুসুমেরা ঠেলাঠেলি করে/ অপরের আগে চায় ললাটকে ছুঁতে।/ /পরিচর্যা সারাদিন, পরিপাটি সাজ/ স্তন যেন বন্ধনেও আরও উজ্জীবক,/ সোনার ঝালর সূক্ষম গাল ও গলাকে/ অনন্ত আদর দিয়ে জড়াতে ব্যাকুল।/ /এসবের চেয়ে আরও সুখী মনে হয়/ সোনা-পাড় রিবনকে, এমনই গড়ন/ ছুঁয়ে থাকে, চাপ দেয় স্তনের উপরে।/ /আর কটিবন্ধ তার কোমর জড়িয়ে/ বলছে যেন, এখানেই থাকি আজীবন!/ আমার দু-হাত তবে জড়াবে কোথায়?’
এসব পড়তে পড়তেই ভাবনার ভেতর প্রশ্নের ঝাপটা—কবিতা কি শিল্পকাজের মানুষদের অপরিহার্য অর্ন্তভেদী উচ্চারণ?
সূত্র:
Complete Poems and selected letters of Michelangelo: T. by Creighton Gilbert; Michelangelo: Nicholas Wadley; Michelangelo: E.H. Ramdan; Lives of the Artists: Giorgges Vassari; Italian painters of the Renaissance: Bernard Berenson; পাশ্চাত্য চিত্রশিল্পের কাহিনী:বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়; মিকেলাঞ্জেলো, তাঁর কবিতা:পূর্ণেন্দু পত্রী; ইউরোপের ভাস্কর্য:অশোক মিত্র
