‘ধ্বংসের বিপরীতে নির্মাণের যে ধারা, তা কবিতারই’

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৩, ১৮:৩৮
পঞ্চাশের আত্ম-নিমগ্ন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। বাংলা কবিতায় তাঁর অবস্থান একান্ত নিভৃতে। ‘কবিকণ্ঠ’ নামক কবিতা-পত্রিকা এবং বসন্তকালীন কবিতা উত্সবের প্রবক্তা ফজল শাহাবুদ্দীন তাঁর কবিতায় নির্মাণ করেছেন একটি একাকী জগত্। যে জগতে প্রেম, প্রকৃতি এবং বিধাতার পাশাপাশি তাঁর একান্ত অবস্থান। নিভৃতচারী এ কবির সাক্ষাত্কার নিয়েছেন শাহীন রেজা আপনি শুধু কবিই নন—একজন কবিতা সংগঠকও। অনেকের ধারণা, সংগঠক হলে কবি হওয়া যায় না— আপনার কী মত? এ বিষয়ে আমার পৃথক কোনো মত নেই—আমি এখন যা লিখছি এবং এত দিন যা লিখে এসেছি, সেইসব পঙিক্তগুলো যদি কবিতা হয়ে থাকে, তাহলে এ দুয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, সংঘাত নেই। আর এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত তো বিশাল সূর্যের মতো একজন আছেনই—স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। জগতের শ্রেষ্ঠ কবি আর সর্ব বলিষ্ঠ কাব্য-সংগঠক আছেন আমাদের ভাষায়। কবিতায় প্রতিনিয়ত বাঁকবদল ঘটছে—রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, তারপর আপনারা এবং বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম—কবিতা ক্রমশ তার চরিত্র পাল্টাচ্ছে, বদলাচ্ছে তার গঠন এবং উপস্থাপনশৈলী—এই যে পরিবর্তন, একে আপনি কোন চোখে দেখছেন? কবিতা নিয়ে এখন অর্থাত্ এ যুগে আমাদের বাংলা ভাষায় যা ঘটছে এবং পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায়ও যা ঘটছে, তার মধ্যে আমি তো কোনো অসমাঞ্জস্য কিংবা অনভিপ্রেত কিছু প্রত্যক্ষ করছি না। তুমি যেসব লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছ, তার সবই জগতের সকল সক্রিয় ও জীবন্ত ভাষায় ঘটছে—আগেও ঘটেছে এবং ঘটতে থাকবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের কবিতা পৃথিবীর সকল জীবন্ত ভাষার কবিতার মতোই প্রাণবন্ত আর সমকালীন। কবিতা আর কথাসাহিত্য—দুটি ধারার মধ্যে কোনটিকে আপনি শক্তিশালী মনে করেন? আধুনিক বাংলা ভাষার কথা যদি বিবেচনা করি এবং বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করতে চাই, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে—কবিতা। প্রকৃত প্রস্তাবে আমি বলতে চাই, সারা বিশ্বের বড় বড় কবিদের কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, এমন কবিতা আমাদের ভাষার কবিরাও লিখছেন। অনেকে বলেন, আমাদের কবিতা এবং কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে উঠে আসা উচিত ছিল, ঠিক সেভাবে উঠে আসেনি—আপনি কী বলেন? মুক্তিযুদ্ধের সময়কে নিয়ে আমি একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছি, যার নাম ‘আততায়ী সূর্যাস্ত’—এটুকু বলতে পারি। এখন এ নিয়ে রাজনীতি করছেন কেউ কেউ—আমি শুধু একজন কবি। আমি তেমন কিছু করতে পারি না এবং চাইও না। আমি শুধু জানি, দেশের জন্য রক্ত দিয়েছে এ দেশের মানুষ—এটাই সত্য। তেমনি দেশও সত্য। উপন্যাস লিখে আপনি মামলার শিকার হয়েছিলেন। সেই উপন্যাস এবং মামলা হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন— সে তো অনেক লম্বা কাহিনি। আমার শুধু মনে পড়ে, কাহিনিটি বাস্তব। সে সময় কলকাতায় সমরেশ বসুর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। পরে কলকাতায় দেখা হলে সমরেশ দা বলেছিলেন, তুমি আমার ওপর দিয়েও টেক্কা মেরেছ। পুলিশ তোমাকে আমার আগে শ্রীঘরে নিয়েছিল। সমরেশ দার বইটির নাম ‘প্রজাপতি’ আর আমার কাহিনির নাম ‘অরণ্য রাত্রি’। কাহিনিটি লেখার সময় আমার বয়স ছিল আঠারো কি উনিশ বছর। আপনার বেশকিছু কবিতায় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ অত্যন্ত সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আপনার এই যে অবসেশান, এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? মুক্তিযুদ্ধে ডুবে থাকা একজন কবির মতোই। আপনি একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘যদি ভালবাসতে চাও তাহলে অন্ধ হও’—ভালোবাসার সাথে অন্ধ হওয়ার কী সম্পর্ক? জগতের বহু মহত্ ঋষিতুল্য ব্যক্তিই বলেছেন, সত্যিকারের প্রেমিকরা আসলেই অন্ধ! সেই সূত্রে গাঁথা এ পঙিক্ত। আমি লিখেছি, ‘যদি ভালোবাসতে চাও তাহলে অন্ধ হও বধির হও’। আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘তৃষ্ণার অগ্নিতে একা’। এই যে তৃষ্ণা, এই যে অগ্নি—এটাই একজন কবির আসল উপলব্ধি ও একান্ত উপকরণ? এ সম্পর্কে আপনার ব্যাখ্যা কী? আসলে তা-ই। তবে সে জন্য একজন কবিকে সত্যিকার অর্থে বড় কবি হতে হবে। বর্তমানে কবিরা রাজনৈতিক মঞ্চে উঠছেন। রাজনীতি কি কবিতার জন্য ক্ষতিকর? আমার শিক্ষক, কবি সৈয়দ আলী আহসান বলতেন, যদি কবিতার প্রার্থনায় ডুবে যেতে চাও, তাহলে রাজনীতির ডমরু থেকে দূরে থেকো। আমি সেই কথা অনুযায়ী একটি প্রচেষ্টার মধ্যে সকল সময় অবগাহন করে চলেছি। আপনি একজন আড্ডাবাজ মানুষ হিসেবে পরিচিত। আড্ডার সাথে কবিতার কোনো সম্পর্ক আছে কী? যখন আড্ডায় মিশে যাই, তখন মনে হয়—আছে। আপনার দুই বন্ধু—শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ—এঁদের সম্পর্কে যদি কিছু বলতে বলা হয়, তাহলে আপনি কী বলবেন? ওরা দুজনেই এখনকার বিশ্বের সেরা কবিদের দলে কাজ করেছেন এবং করছেন। কবি হওয়ার পেছনে আপনার প্রধান অনুপ্রেরণা কে? বিধাতা এবং তাঁর অচিন্ত্যনীয় সৃষ্টি। আপনার কবিতার মূল সূত্র ‘ঈশ্বর নারী এবং প্রকৃতি’। এ তিনটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হলে আপনি কোনটি বেছে নেবেন? আমি এই তিনটিকে মন্থিত করে এক কান্নার মধ্যে মিশিয়ে নিয়ে তা সারা জগতের অন্তর্গত অনুভবের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। আপনি প্রায়ই বলেন, বাংলা ভাষায় কবিতা লিখে নোবেল পাওয়া অসম্ভব। এটা কেন বলেন—একটু স্পষ্ট করে বলবেন কি? রবীন্দ্রনাথের পর কেউ নোবেল প্রাইজ পাবেন না বাংলা কবিতার জন্য—এটা ঠিক হয়নি। এটা আমার ধারণা। যদি সমকালীন বিশ্ব কবিতায় বাংলা কবিতার স্থান চিহ্নিত করতে বলি— পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর বহু কবিতা এখন বাংলা ভাষায় আমাদের দেশে অর্থাত্ বাংলাদেশে রচিত হচ্ছে। আপনি একদা বলেছিলেন, ‘কবিতাই বিপন্ন বিশ্বকে বাঁচাবে’। আজও কি সেই বিশ্বাসে আপনি আস্থাশীল? আপনার এই ধারণার উদ্ভব সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন— কথাটি আমি বলেছিলাম। আর এটি এখনো আমার বিশ্বাস। আমি মনে করি, অসুস্থ রাজনীতি আর দুষ্ট মানুষেরা যেভাবে বিশ্বকে কলুষিত ও বিপন্ন করে চলেছে, তার বিপরীতে বিশ্বব্যাপী একটি সুস্থ ধারা রচনা করতে হবে। আর এর নেতৃত্ব দিতে হবে কবিদের মতো স্বপ্নাশ্রয়ী এবং সত্ মানুষদের। ধ্বংসের বিপরীতে নির্মাণের যে ধারা, তা কবিতারই। তাই ‘কবিতাই বিপন্ন বিশ্বকে বাঁচাবে’—বলে আমার ‘একদা’র যে উক্তি, তা সেদিন যেমন প্রবল ছিল, এখনও তেমনি আছে এবং থাকবে অনন্তকাল।