বাংলাদেশে সমাজ-বিজ্ঞান গবেষণার প্রসঙ্গসূত্রে সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের সমস্যা নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এ দেশের মুসলমানেরা যখন কোনো কাজ শুরু করেন, তখন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করেন। এটা একটা সামাজিক রেওয়াজ। আমি ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করতে চাই। বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে, ‘বিসমিল্লায় গলদ,’ এর অর্থ হচ্ছে সূচনায় ভুল থাকা। বিষয়টি গুরুতর, কারণ সূচনায় ভুল থাকলে পরবর্তী পর্যায়ে সেই ভুল আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। উইলিয়াম কেরী, যিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বাংলা ভাষা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার প্রভূত উন্নয়ন ঘটিয়েছেন, তিনি প্রবাদ সংগ্রহ করেছেন এবং পরবর্তীকালে জেমস লঙ একটি ‘প্রবাদমালা শীর্ষক’ সংকলনও প্রকাশ করেছেন, তাতে দেখলাম বাক্যটি ‘বিসমোল্লায় গলদ’। সম্ভবত বিসমিল্লা বলতে গিয়ে বা শুনতে গিয়ে ‘মোল্লা’র কথা মনে হওয়ায় বিসমিল্লাহ বলতে গিয়ে ‘বিসমোল্লা’ বলা হয়ে গেছে।
শোনা ও বোঝার মধ্যে পার্থক্য
এ রকম ঘটনা আরও আছে। ব্রিটিশ আমলে বাঙালিরা কী বলেছে, আর ব্রিটিশেরা কী শুনেছে, তার একটি চমত্কার দলিল পর্যায়ের অভিধান আছে। অভিধানটির নাম ‘হবসন-জবসন’। ব্যাপারটি হচ্ছে, ব্রিটিশরা কোম্পানি আমলে এসে সবেমাত্র কর্মকাণ্ড শুরু করতে যাচ্ছে। এমন সময় একদিন তারা দেখতে পেল, রাস্তায় বেশ কিছু লোক শোভাযাত্রা করে যাচ্ছে এবং এর মধ্যে কিছু লোক দড়িবাঁধা একটি চকচকে কিরিচের গুচ্ছ ঘাড়ের ওপর দিয়ে কাঁধের এক পাশ থেকে আরেক পাশে নিচ্ছে আর সকলে বুক থাপড়িয়ে থাপড়িয়ে সম্মিলিতভাবে হবসন-জবসন বলছে। দৃশ্যটি তাদের হতভম্ব করেছিল। এই ব্যাপারটি ব্রিটিশ ও বাঙালিদের মিথস্ক্রিয়ার একটি পর্যায়ের পরিচয় দেয়। ব্যাপারটি হচ্ছে, ব্রিটিশরা তখনও বাঙালি জীবনে অভ্যস্ত হয়নি। বাঙালিরা কী কথা বলে এবং ব্রিটিশরা কী কথা শোনে, তা সুস্পষ্ট হয়নি। প্রকৃতপক্ষে সেই শোভাযাত্রাটি ছিল একটি মহররমের মিছিল। কারবালার শহীদ ইমাম হাসান-হোসেনের স্মৃতিবাহী এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা ‘হায় হাসান হায় হোসেন’ এই বলে মাতম করছিল। আর সদ্য-আগত ব্রিটিশরা তাদের পরিচিত ইংরেজি ধ্বনির শ্রবণসাম্যে শুনেছিল ‘হবসন-জবসন’। কর্নেল উইল বার্নেল এ রকম অনেক শব্দ সংগ্রহ করে সেগুলোর ব্যবহারের দৃষ্টান্ত দিয়ে একটি অভিধান তৈরি করেন, তার নাম দেন ‘হবসন-জবসন’।
বিসমিল্লায় গলদ
বিসমিল্লায় গলদ যে উইলিয়াম কেরীর সংগ্রহের ‘বিসমোল্লায় গলদ’ হয়ে গেছে, সেটা সম্ভবত এ রকম কোনো ভুল বোঝাবুঝির কারণে। একসময় বিসমিল্লাহির পরে ‘রহমানির রহিম’ লেখা হতো। কিছুদিন থেকে ‘রহিম’ ও ‘রহমান’ যথাক্রমে ‘রাহিম’ ও ‘রাহমান’ হয়ে গেছে। তদুপরি এক সময়ে প্রায় শতভাগ লোকই ‘খোদা হাফেজ’ বলতেন। হঠাত্ দেখা গেল, কেউ কেউ খোদা হাফেজ বাদ দিয়ে আল্লাহ হাফেজ বলা শুরু করেছে। ক্রমে খোদা হাফেজ শব্দ দুটো আল্লাহ-হাফেজে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়তোবা কারও ক্ষমতা, কারও ইচ্ছা, কারও ফ্যাশনের প্রভাবে খোদা-হাফেজ কথাটি আল্লাহ-হাফেজে রূপান্তরিত হয়েছে। এই রূপান্তর সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। সমাজ-ভাষাবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক আলোচনা। এই বিজ্ঞানটি মার্কিন ভাষাতত্ত্ব চর্চায় সম্প্রতি যুক্ত হলেও এর ইতিহাস খুব সাম্প্রতিক নয়।
রুপার্থ ফার্থের অবদান
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী রুপার্থ ফার্থ ১৯৫০ সালের দিকেই ‘Sociological linguistics’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এই প্রবন্ধে তিনি সমাজ-বিজ্ঞানের সঙ্গে ভাষা-বিজ্ঞানকে সমন্বিত করে বুঝতে চেয়েছিলেন। ফার্থের ছাত্র ছিলেন মুহম্মদ আবদুল হাই। তিনি ফার্থের লেখা গভীর মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করেছিলেন এবং বাংলাদেশে ফিরে এসে ফার্থের ধারণার সারবস্তু নিয়ে লিখেছিলেন তাঁর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘ভাষা ও সমাজ জীবন।’ কিন্তু এই লেখা বাংলাদেশে যাঁরা সমাজবিজ্ঞান চর্চা করেন অর্থাত্ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, লোকপ্রশাসন বিজ্ঞানী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদ, গণ-যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ তথা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কোনো কোর্সে পঠন-পাঠন করা হয় না। ফলে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সমাজ-বিজ্ঞান চর্চা থেকে সমাজ-ভাষাবিজ্ঞান অসংলগ্ন হয়ে আছে। অথচ সবাই জানেন, ভাষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক অতি প্রাচীন ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সর্বব্যাপ্ত। সমাজগঠনে যেমন ভাষার ভূমিকা থাকে, তেমনি সমাজ-বিকাশের ক্ষেত্রেও ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজ-সংরক্ষণেও তার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না, আর সমাজ উন্নয়নেও তার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং সামাজিক গবেষণার প্রতিটি রন্ধ্রে বিবেচনা স্থান পেতে পারে।
পুরোনো সমাজ ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের সমাজ অতি পুরোনো, কত পুরোনো—তা এককথায় বলা যাবে না। দেড় হাজার-দুই হাজার থেকে তিন হাজার বছর তো হবেই। মহামতি অশোকের সময় থেকে লিপি-প্রযুক্তির প্রচলন লক্ষ করা যায়। লিপি-প্রযুক্তি আবিষ্কারের পর থেকে মানুষের জ্ঞানের জগত্ সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রজ্ঞার জগত্ স্থৈর্যপ্রাপ্ত হয়েছে। সুতরাং এই পুরোনো সমাজ একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে। তার মধ্যে আছে লৈখিকতার যুগের সম্পদ ও মৌখিকতার যুগের সম্পদ। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা চল্লিশ ভাাগ এখনও নিরক্ষর অর্থাত্, প্রযুক্তিগত দিক থেকে তারা সাড়ে তিন হাজার বছর আগের অবস্থায় আছে। সুতরাং সমাজ উন্নয়নের জন্য যাঁরা গবেষণা করবেন, তাঁদের অবশ্যই মৌখিক ঐতিহ্যে আনতে হবে। নয়তো উন্নয়ন-প্রত্যাশীদের আদেশ, উপদেশ, পরামর্শ তাদের কাছে সহজে পৌঁছবে না। আমরা অনেক সময় দেখি লেখা আছে ‘এখানে প্রবেশ নিষেধ, ‘এখানে পার্কিং নিষেধ’ এই লেখা যারা বুঝতে পারে না, তাঁদের কাছে নিষেধবার্তা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। ফলে তাঁরা নিজের অজান্তেই নির্দেশ অমান্য করে অপরাধজগতে প্রবেশ করে অপরাধী হিসেবে পরিগণিত হন। এই কথা সরকারি নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি স্বাস্থ্য-সেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝানো যেতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের দৃষ্টান্ত
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অভ্যন্তরে একটি রেডিওলোজি ও ইমেজিং বিভাগ আছে, তার ওপরে আছে একটি উপাসনা-ঘর, ঘরটি চতুষ্কোণ নয় এবং পাশেই আছে একটি বর্জ্যক্ষেত্র। বর্জ্যক্ষেত্রটি সমস্ত হাসপাতালের বর্জ্যের ডিপো। সেখান থেকে কাকেরা সমস্ত বর্জ্য ছড়িয়ে দেয় এদিক-ওদিক। যেসব কর্মচারী বর্ণ-জ্ঞানের অভাবে কিংবা অসচেতনতার অভাবে এই কাজ করেন, তাঁরা নিজের অজান্তেই সামাজিক অপরাধ করে থাকেন। এ ধরনের বিষয়গুলো উপলব্ধি করার জন্য সমাজ-ভাষাবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে জন্যই এর অনুশীলন একান্ত প্রয়োজন।
মোবাইল ফোনের রি-রেজিস্ট্রেশনের দৃষ্টান্ত
দেশে যখন মোবাইল ফোন চালু হয়, তখন কোনো রেজিস্ট্রেশন-প্রথা ছিল না। মোবাইল একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং এ অগ্রগতি সামাজিক সংজ্ঞাপন বা Social Communication-এর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। গ্রামের অশিক্ষিত নারীকর্মী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত এ মোবাইল ফোন ব্যবহূত হচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন আগে পর্যন্ত সরকারি অফিসে মোবাইল ক্রয় ও ব্যবহারের জন্য নিষেধাজ্ঞা ছিল। এখন আছে কি না জানি না। প্রথম যখন শুরু হয়, তখন কোনো রেজিস্ট্রেশন-প্রথা ছিল না। এখন একটি রি-রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করে পূর্বতন গলদটি সংশোধনের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ফরমটি যে ভাষায় ছাপানো হয়েছে, তা হলো ইংরেজিতে, যে কালিতে ছাপানো হয়েছে তা দুষ্পাঠ্য, অথচ মোবাইল কোনো শিক্ষিত ও সুশীল সমাজের ব্যাপার নয়। সুশীল সমাজ ইংরেজি, বাংলা, আরবি জানে বলে তাঁদের হয়তো অসুবিধা হয় না, কিন্তু অশিক্ষিত মানুষ কীভাবে এই ফরম পূরণ করবে, তা একবারও ভাবা হলো না। এটা নিয়ে এখন অনেক দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রথমেই গলদ, পরবর্তী গলদকে আরও সম্প্রসারিত করবে। গলদের নিয়ম হচ্ছে তা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের সমস্যার পূর্বানুমান করার ক্ষেত্রে সমাজ-ভাষাবিজ্ঞান একটি উত্তম বিষয়।
ভাষাবাণিজ্য ও ধর্মবাণিজ্য
মানুষ মারণাস্ত্র নিয়ে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তেমনি ভাষা নিয়েও বাণিজ্য করে। ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’—এই প্রবাদ আমরা জানি, কিন্তু লক্ষ্মীপূজা না করলে লক্ষ্মীর কৃপা অর্জন করা যায় না। সে জন্য এ দেশের পূজা-বিশ্বাসী উপাসক-সম্প্রদায় লক্ষ্মী পূজা করে থাকে। লক্ষ্মীকে তোয়াজ-তোষামোদ করতে হয়। তবেই লক্ষ্মী ঘরে আসে। এ দেশে যাঁরা হাজী মুহম্মদ মহসীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দয়ার সাগর উপাধি অর্জন করতে চান, যাঁদের আমরা সচরাচর বাংলায় বলি দাতা-সংস্থা, ইংরেজিতে ডোনার, তারাও লক্ষ্মীর মতো তোষামোদ-খোসামেদ অর্থাত্ প্রশংসা কিংবা পূজা পেতে চায়। এই বাণিজ্যকে প্রাচীনকালে বলা হতো ধর্মবাণিজ্য। এখন শব্দটি মুখে প্রচলিত নেই, কিন্তু অভিধানে আছে। ধর্মবাণিজ্য ও ভাষা-বাণিজ্য পরস্পর সম্পর্কিত, কারণ ভাষা ছাড়া প্রার্থনা হয় না, পূজা হয় না, আশীর্বাদ হয় না। আধুনিককালে মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয় না, এগ্রিমেন্ট হয় না। তাই ধর্মবাণিজ্য ও ভাষাবাণিজ্য পরস্পর নির্ভরশীল। একটি ছাড়া অন্যটির তরক্কি হয় না। ধর্মসভা, কনগ্রিগেশন কিংবা ওয়াজ, সারমন ইত্যাদি বিষয় ধর্ম সম্পৃক্ত হলেও এতে ভাষার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাণিজ্য ও সংজ্ঞাপন
বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সংজ্ঞাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। উদ্বৃত্ত পণ্যের কথা, উদ্বৃত্ত শ্রমের কথা, অধিক মুনাফার কথা, ব্যাপক লাভের কথা, মানুষকে লোভাতুর করার জন্য মিষ্টি কথা যদি বলা না হয়, তাহলে খরিদদার জানবে কী করে? তাই বাণিজ্যের জন্য সংজ্ঞাপন একটি উচিত কর্ম। এই কর্ম সুসম্পাদনের জন্য অনেক সংস্থা বা ফার্ম গড়ে উঠেছে। এগুলোকে বলা হয় অ্যাডভারটাইজিং ফার্ম বা বিজ্ঞাপনী সংস্থা। এদের কাজ হলো পণ্যের ব্যাপারে মানুষকে উত্সুক করে তোলা। প্রয়োজনীয় সংবাদ দেওয়া ও প্রাপ্তিস্থানগুলো বিভিন্ন মিডিয়া অর্থাত্ প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ইত্যাদির মাধ্যমে তারা এ কাজগুলো করে থাকে। এখন সুশ্রী ভদ্রমহিলারা এই বাণিজ্যকর্মে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছেন এবং তাতে ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’—প্রবাদটি নতুন একটি অর্থ-মাত্রা লাভ করছে। বাণিজ্য ও সংজ্ঞাপন সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যয়নের বিষয়। দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, স্বদেশি পণ্যের ক্ষেত্রেও সত্য।
