‘শইল্যে আর কুলায় নারে ভাই।’
কুলোবারও কথা নয়। সাধারণত মানুষের কর্মক্ষমতা পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়স পর্যন্ত। এরপর যা থাকে, তা বোনাস। ইউরোপীয়দের কথা আলাদা। তারা অবশ্য ষাট-সত্তর বছর বয়স পর্যন্ত স্ট্রেংথলি কাজ করতে পারে। এর জন্য তাদের খবার-দাবারসহ রুটিন মাফিক জীবনব্যবস্থা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে আমরা বেশ অসহায়। সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয় না অনেক কিছু।
‘বয়স তো আর কম হইল না। এবার ইতা বাদ দিলাও।’
‘খাইমু কিতা? বুড়াকালও না খাইয়া মরতামনি?’
নরেশ পাল যে রকম জানে, এই কাজ ছেড়ে দেওয়া মানে অনাহারের সাথে আলিঙ্গন করা। সল্টু সুমনও তা জানে। আজকাল সুমনের মতো অনেকেই তার সাথে এই মায়াবাড়ানিমূলক আচরণ করে। নরেশ পালের ভাষায় এটি আগলামায়া। আগে অবশ্য এ রকম কথায় সে বলত ‘এত আগলা মায়া দেখানির দরকার নাই। একবেলা খাওয়ানির মুরদ নাই, আর হুকনা পিরিত দেখানিত আও?’ কথাগুলো বেশ ঝাঁঝের সাথে বললেও আওয়াজ প্রায় ক্ষীণই শোনায়। কথা বলার সময় গলার রগগুলো প্রায় বেরিয়ে আসতে চায়। লম্বা চোঁয়াল বের করে দাঁত খেঁচকি মেরে রাগে গড়গড় করে কথাগুলো বলে। গ্লাসবয়ের কাজ নিয়ে সে মা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ঢুকেছিল। তারপর মেসিয়ার হয়ে আজ পুরোটাই পরোটার কারিগর। এই কাজের সুবাদে বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করলেও পেশা হিসেবে এই পরোটার কারিগরই রয়ে গেছে। এ নিয়ে তার নাতি-সমপ্রদায়ে বেশ রসালো কথার প্রচলন আছে। ‘হালা বুড়া অইছে তবু টিপাটিপি ছাড়তো পারছে না। পাঁচ আঙ্গুলোর কামো কী যে মজা পাইছে।’ তার এই পেশার বয়স তার বয়সের দুই-তৃতীয়াংশ। এই দীর্ঘ সময়ে সে এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ শিখেনি। শিখতে পারেনি। বাবার সহায়-সম্পত্তি বলতে একটুকরো ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। যুবক বয়সে কিছুদিন মানুষের ঘরে রোজ বেতনে কামলা খাটলেও পরে আর এই কাজে সে মন বসাতে পারেনি। ফলে বেশ কিছুদিন বাউণ্ডুলে জীবন যাপন করে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করে; আর গত হওয়া বাপের প্রতি খিস্তি আওড়ায়। ‘নাদানের পুত, এক চটাক জেগা যদি রাইক্কা যাইতে না পারছোত, তে হুরুত্তাইন জন্ম দিছলে কেনে? দেখাদেখি বাবা হইগেছলে? এঙ্গা ফইকরানির পুত।’ নরেশের বাবা শৈলেন পাল এক ছেলে এক মেয়ে রেখে ইহোলোক ত্যাগ করে। মেয়ে বড়ো হওয়ায় শৈলেন পাল নিজহাতে কন্যাদান করে গেছে। নরেশ তাই একটু ভারমুক্ত হওয়ায় খেয়ে না খেয়ে কিছুদিন বাবার ভিটায় বাতি জ্বালাবার জন্য থাকলেও এখন সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে কাজের সন্ধানে শহরে যাবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। বাড়ি থেকে বের হয়ে সে শহরে মা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে কাজ পেয়ে যায়। আর এভাবেই তার যাত্রা শুরু। এই ভাটি সময়ে এসেও যখন নরেশ দেখে, তাকে দিয়ে আর কিছু হবে না, তখন সে এই ময়দার খামির মাঝে নিজেকে সপে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চায়। এই ময়দার খামির প্রতি তার প্রেম তাকে আর সংসারী হতে দিল না। না সে নিজেই সংসার-বিবাগী হয়েছে, কেউ বুঝতে না পারলেও নরেশ তো জানে, কেন সে সংসার করেনি। তার নাতি-সমপ্রদায়দের সে অবশ্য মজা করে বলে, ‘হুনো হালাইন, ময়দার মাঝে একটু সুডা, ইস্ট, লবন, ডালডা, সোয়াবিন দিয়া যে সময় পরোটার খামি বানাই, ইসময় কছলানির মাঝে যে আরাম লাগে, ষোল্ল বছরোর একটা পুরির বুনি টিপলেও ইলাখান আরাম পাইতাম নায়। এল্লাগি দেখোনানি বিয়া-সাদি করি না। এই পরোটার খামিরে বউর বুনি মনো কইরা জীবন কাটাই দেরাম। ভালাঅত্ত আছি।’ অথচ তার এই কথার ভেতরে যে হাহাকার, সে ছাড়া আর কে জানে? কাউকে সে বুঝতে দেয় না, তার এই যন্ত্রণার আগুনের দাবদাহ। নিজের মনে নিজেই সে আগুনে পুড়ে আঙরা হয়। আর সেই আঙরা একত্র করে হাতের তালুতে নিয়ে ফুঁক দেয়, যদি সেই ছাইটুকু নির্মলার গায়ে গিয়ে পড়ে, তাহলে হয়তো তার এই একাকিত্বের কষ্টটা একটু হলেও লাঘব হবে। কিন্তু তা আর হবার নয়। নির্মলা স্বামী-সংসার, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সুখেই আছে। নরেশের নীরবে ঝরে যাওয়া অশ্রু কিম্বা কোনো কষ্টই আর তাকে স্পর্শ করতে পারে না। অথচ নির্মলা যখন নরেশের সামনে উফ্ বলত, তখন তার কলিজা ছ্যাঁত্ করে উঠত। শিকারি বাঘের মতো তাকে জাপটে ধরে বলত, ‘কিতা অইছে তোমার? কোনানো দুখ পাইছ? মা কালীর দিব্যি, লুকাইয়ো না।’
‘রাম রাম, তোমার কিতা অইছে কওছাই, একটুর মাঝেই দিব্যি দিলাও? আইচ্ছা, ঐ যে তুমি আমারে এত ভালাপাও যদি অন্য কোনোখানো আমার বিয়া হই যায়, হি সময় কিতা করবায়?’
‘গোবিন্দ আশ্রম লওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত নায়।’
‘তাইলে আও, আশ্রম লওয়ার আগে আমার পিসির বাড়ি থাকি ঘুড়িয়া আই।’
নরেশকে সে রাজি করাতে পারে না। নরেশ জানে, পিসির বাড়ি যাওয়া মানে নির্মলার সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ার প্রলোভন ছাড়া আর কিছু নয়। যে রকম এর আগে নির্মলা করেছিল। একদিন বিকেলে বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে নির্মলা নরেশের কাজের যায়গায় এসে হাজির হয়। তার পিসির শরীর খারাপের দোহাই দিয়ে তাকে কোনো রকম কথা কিম্বা কালক্ষেপণ করতে না দিয়ে তার পিসির বাড়ি নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে যখন নরেশ দেখতে পায়, তার পিসি অসুস্থ নয়, তখন নির্মলাকে সে প্রশ্ন করে, কেন তাকে মিথ্যে বলে এখানে নিয়ে এসেছে? নির্মলা হেসে বলে, অসুস্থ ঠিকই, তবে তার পিসি নয়। অসুস্থ সে। নরেশ তার কাছে জানতে চায়...
‘কই, তোমার শৈল্য অসুখ আমারে দেখি কইলায় না?’
‘কওয়ার লাগিই তো লইয়া আইছি।’
‘এত দূর?’
‘এত দূর না আইলে একলা ঘর পাইতামনি?’
‘অসুখোর কথা কইতে একলাঘর লাগেনি?’
‘এ বেমারোর কতা কইতে লাগে।’ বলে সে নরেশের হাত ধরে নিয়ে খাটের ওপর বসায়। খাট বলতে বাঁশের খুঁটি আর সুপারি গাছের ছাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাটের আকৃতি দেওয়া। তার ওপর একটি মুর্তার পাটি আর পাতলা একটি কাঁথা। গ্রামের আর দশটা হিন্দু পরিবারের মতো নির্মলার পিসির ঘর। তার পিসিমশাই গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো। এখন একমাত্র পিসতুতো বোন শেফালিকে নিয়ে তার বুড়োপিসি প্রায় একলাই এ বাড়িতে থাকে। শেফালি নির্মলার সমবয়সী হওয়ায় সে বুঝতে পারে, নির্মলার এভাবে নরেশকে নিয়ে আসার কারণ। তাই সে নিজের রুমটি নির্মলাকে ছেড়ে দিয়ে মায়ের সাথে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নির্মলা অনেক দিন পর তাদের বাড়িতে এসেছে। সঙ্গে আবার নরেশ দা। নেমন্তন্য না-ই বা হোক, বাড়ির ওপর অতিথি আসলে তো আর খালিমুখে যেতে দেওয়া যায় না। এতে গৃহবাসীর অমঙ্গল হয়। শেফালি যখন তার মায়ের সাথে টুকটাক নাস্তা বানাতে ব্যাস্ত, তখন নির্মলা নরেশের গা-ছোঁয়া হয়ে বসে ডান হাত দিয়ে নরেশের শার্টের বোতাম খুলতে চায়। নরেশ তাতে নড়ে বসে।
‘কিতা অইছে তোমার, ইতা কররায় কেনে?’
‘কিতা কররাম? (একটু ঝাঁঝ নিয়ে) আমি তোমার বুকো ঘুমাইতাম চাই। মার দিব্যি, আমারে একটু তোমার বুকো ঘুমাইবার দেও।’
তারপর নির্মলা নরেশের শার্টের বোতাম খুলে তার লোমশ বুকে হাত বোলাতে থাকে। নাকের সাথে নাক ডলা দেয়। হাত চেপে ধরে। একসময় পাকা আতাফলের মতো সুবিন্যাস্ত তার স্তনযুগলে নরেশের হাত লাগামাত্র নরেশের সারা দেহ হিম হয়ে আসে। যেন পৌষের কোনো মজাপুকুরে কেউ তাকে চুবিয়ে রেখেছে। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের স্পর্শকাতর জায়গায় তার হাত লেগেছে। সে এই জায়গা থেকে হাত সরিয়ে আনার চেষ্টা করে। পারে না। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি দিয়ে নির্মলা তার বুকের সাথে নরেশের হাত বেঁধে রেখেছে। নরেশ ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তার হাত সরিয়ে আনে এবং শুধু বলে, ‘ইটা পাপ’।
ততক্ষণে নির্মলা ক্ষিপ্র বাঘিনীর মতো তার ওপর হামলে পড়ে। নরেশ নিজেকে যতই সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে, নির্মলা ততই আঠালো সাপের মতো ফুঁসফাঁস করে। কখনও নরেশের চুল টানে, কখনও মুখ এনে চেপে ধরে তার বুকের সাথে। নরেশ হাজার ভোল্টেজের ইলেকট্রিক শক খায়। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে আসে। চুলের গোড়া দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরতে থাকে। পায়ের পাতা ঝিম ধরে আসে। হাতের তালুতে যেন শক্তির অভাব। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘ইটা পাপ।’ নির্মলা এবার আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। মুখে লবণ দেওয়া জোঁকের মতো ছটফট করে। আর বিনয়ের সাথে বলে, ‘নরেশ দা, আমি তোমার কাছে আর কিচ্ছু চাই না। আমার বুকো তুমি দাঁত দিয়া কামড় দেও, যাতে ওই দাঁতোর দাগ সারা জীবন থাকি যায়। আর আমি তোমার কথা মনে অইলে এই দাগ দেখিয়া শান্তি পাই। নরেশ দা, আমার এই উপকারটা তুমি করো।’ বলে সে একরকম নরেশের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নরেশ এবারও বলে, ‘নির্মলা, ইটা পাপ।’
সেই থেকে নির্মলা তার পিসির বাড়ি যেতে বললে নরেশ কোনো না কোনো বাহানায় তা ফিরিয়ে দেয়। সে নির্মলাকে ফিরিয়ে দিলেও এ নিয়ে চাপাকষ্টে তার হূদয় তুমুল ঝড়ে ভেঙেপড়া বৃক্ষের মতো তছনছ হয়ে যায়। নিজের অস্তিত্বকে মনে হয় পৌষের বিরাণভূমি। চারদিকে জলের ছড়াছড়ি অথচ সে একফোঁটা জল সেবন করতে পারছে না। কিম্বা সেবন করছে না। পাপবোধটা তার মস্তিষ্কে এমনভাবে আস্তানা গেঁড়েছে, এই বোধের কারণে জগত্-সংসার তার কাছে মাঝে মাঝে নিরামিষ মনে হয়।
নরেশ এখন প্রায় ষাট বছরের বয়োবৃদ্ধ। এই দীর্ঘ সময়ে সে নিজেকে সকল প্রকার শোক-উত্তাপ থেকে আগলে রেখেছে। ভুল হতে দেয় না কিম্বা ভুল করে না। নির্মলাকে তার জীবন থেকে হারিয়ে সে একরকম পাথরের মতো জীবন যাপন করে যাচ্ছে। জগতের কোনো অনুভূতিই যেন তাকে কাছে টানে না। শরীরসর্বস্ব নির্মলাকে সে ভুলতে পারলেও মনের এককোণে কোথায় যেন বায়বীয় নির্মলার স্থান রয়ে গেছে। যে কিনা আজও কোনো বৃষ্টিস্নাত দুপুরে মনের বেহালায় আলগোছে সুর তোলে। টিনের চালে যখন সে বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে পায়, তখন নির্মলার হাসির উপস্থিতি খোঁজে। আর তাতে উচ্ছ্বসিত হয়।
দু-দিনের ছুটি নিয়ে নরেশ তার গ্রামের বাড়ি আসে। মূলত নাড়ির টানেই এই আসা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মৃত্যুভয়টাও পিছু নিয়েছে। জীবনের শেষ নিশ্বাস সে পৈতৃক ভিটায় ফেলতে চায়। তাই এখন প্রায়ই সে এখানে আসে। এ যেন আকাশে ওড়া ঘুড়ির মতো। সারা দিন আকাশে ওড়ার পর আবার নাটাইয়ে ফিরে আসা। প্রতিটা মানুষই এক-একটা ঘুড়ি। নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা এবং সময় শেষে সবাই প্রত্যাবর্তন করে আপন ঠিকানায়। আমাদের গল্পের নায়ক নরেশও তার ব্যতিক্রম যায় না। সারা জীবন উলে-মেলে কাটিয়ে ভাটি সময়ে এসে জন্মভিটার প্রতি মায়া ধরে। এই মায়ার টানে তাকে ফিরে আসতে হয়।
পৌষের সন্ধ্যা। কাল সংক্রান্তি। নন্দীপুরের প্রায় প্রতিটা হিন্দুঘরে পিঠা-পায়েসের ধুম। কেবল নরেশের ঘরটাই যেন এই উত্সব থেকে বঞ্চিত। বাইরের অন্ধকারের মতো একঝাঁক বিমূর্ত কষ্ট বুকের ভেতর চাপা দিয়ে নরেশ খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আজকের দিনের কোনো আনন্দই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। ঘরের ভেতর যেদিকে চোখ যায়, শুধু জিনিপোকার কিলবিল ওড়াউড়ি ছাড়া সে আর কিছু দেখতে পায় না। মাঝে মাঝে হাতজোড় করে কপালের ওপর তোলে, ‘মা, মাগো রক্ষা করো মা’ বলে প্রণাম করছে। হঠাত্ দরজার দিকে চোখ যেতেই ঠাটা পড়ার মতো চমকে ওঠে। মেরুন কালারের শাড়ি পরা একজন মহিলা তার ঘরের দিকে আসছে। সে নিবিড়ভাবে চেয়ে থাকে মহিলার আসার দিকে। মহিলা যখন একেবারে দরজার কিনার ঘেঁসে দাঁড়াল তখন নরেশের মাথা চক্কর দেয়ার জোগাড়। কোনোমতে নিজেকে বলতে নিজের শক্তিমত্তাকে সচল করে, দরজার পাশে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় শুধু বলে ‘তুমি!’ ‘না আইয়া পারলাম না।’ ‘এত দিন বাদে মনো অইল?’ ‘না আইতে পারলেই মনোহয় ভালা থাকতাম।’ ‘আইছ কেনে? আর আইছ যখন তাইলে ঘরো আও।’ নির্মলা ঘরের ভেতর প্রবেশ করে খাটের এককোণে গিয়ে বসে। ‘তুমি একলা আইছ? তোমার বাচ্চাকাচ্চা?’ নির্মলা এবার না-সূচক মাথা নাড়ায়। ‘বাঁচিয়া আছি কি না দেখতায় আইছ?’ ‘তাইলে মনেহয় এত কষ্ট পাইতাম না।’ ‘আইচ্ছা বাদ দেও, তুমি ভালা আছনি?’ নির্মলা কোনো উত্তর করে না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এই দীর্ঘশ্বাস নরেশের বুকে এসে লাগে। সে একটু নড়ে বসে। নরেশ নির্মলার পাশে বসার অনুমিত চায়। এবারও সে নির্বাক। নির্মলা নিজ থেকে উঠে এসে নরেশের পাশে বসে। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ছেয়ে যায় তার অস্তিত্ব। সে নির্মলার দিকে তাকায়। এতক্ষণ ধরে সে এসেছে, অথচ এই প্রথম নির্মলাকে ভালোভাবে দেখছে। কিছুটা অন্ধকার কিছুটা লেমটোনের আলো। এই আলো-আঁধারির মাঝে সে অন্যরকম এক নির্মলার আভাস পায়। যে কিনা পুরো যৌবনে অনুপস্থিত ছিল। তা না হলে বোধহয় আজ এই বয়োবৃদ্ধকালে সংক্রান্তির পিঠা-পায়েসের আনন্দ থেকে তার ঘর বঞ্চিত হতো না। তখনকার নির্মলা যতটা জীর্ণকায় দেহের অধিকারী, আজকের নির্মলা ততটাই স্বাস্থ্যবতী, লাস্যময়ী, রমণীয়-কমনীয় রূপের অধিকারী। মোটকথা এ যেন কামধারে ধারালো টিপু সুলতানের তলোয়ার। যে তলোয়ারের ধারে নরেশ ইতোমধ্যে জখম হতে শুরু করেছে। নরেশ নির্মলার মুখের দিকে তাকায়, বুকের দিকে তাকায়। চুলের গোড়া থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত নিবিড়ভাবে অবলোকন করে নির্মলার শরীরমন্দির। তাই অন্তর-কোঠায় ছ্যাঁত্ করে ওঠে। নির্মলার ভরাট বুকের দিকে তাকিয়ে সে না বলে পারে না। ‘তুমি বাক্কা সুন্দর অইছ।’ কথাটা শোনামাত্র নির্মলার ভেতরটা ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠে। এই সুন্দর তাকে দেখাবার জন্য সে কি না করেছে। অথচ নরেশ! না দেখার ভান করে হোক আর নীতিবোধের কারণে হোক তাকে অবহেলা করেছে কচুরিপানার মতো। আর আজ! এই সুন্দর থেকে তাকে দেওয়ার মতো অবশিষ্ট কিছুই নেই অথচ আজ তার দৃষ্টি পড়েছে এই সুন্দরের দিকে। নির্মলা বুঝতে পারে, নরেশ এই সন্দর বলতে কী বুঝিয়েছে। তাই একটু মুচকি হেসে বলে, ‘এর থাকিও বেশি সুন্দর তোমারে দেখাইতাম চাইছলাম, দেখলায় না। সারাজীবন শুধু অপরাধী করি রাখলায়।’ নরেশের ইচ্ছে করে বলে, এখন কি সেই সুযোগ নেই? এই সুন্দরে সে একটু হাঁটাচলা করতে চায়। দেখে আসতে চায় সুন্দরের ভেতরে সুন্দরকে। কোনোরকম রাখঢাক ছাড়াই সে নির্মলার হাত তার হাতের মুঠোয় নেয়। আর অনুভব করে, নির্মলা এইমাত্র যেন গোলাপজল দিয়ে স্নান করে এসেছে। তার শরীর থেকে গোলাপের রোশনাই বেরোচ্ছে। সেই ঘ্রাণে মাতোয়ারা নরেশের দেহ-মন। অগ্রহায়ণ মাসের আমন ধানের লাচ্ছির মতো নির্মলার চুল পিঠ বেয়ে কোমর পর্যন্ত গড়িয়েছে। নরেশ বারবার লুকিয়ে সেদিকে তাকায়। কিন্তু নির্মলার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। চুল দেখার অজুহাতে সে যে নির্মলার কোমরের ভাঁজ দেখে আসছে, নির্মলা ভালোই টের পায়। নরেশ যতই নির্মলার দিকে তাকায় ততই তার ভেতরে অদৃশ্য সাইরেন বাজতে থাকে। এ সাইরেন কেবল ভুলের সিগন্যাল দিয়ে যায়। নরেশ আস্তে করে নির্মলার চুলের গোছা ধরতে গিয়ে কোমর স্পর্শ করে। তার হাত ধীরলয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে এবং পিঠে এসে আটকে যায়। এখানে হালকা ঘষা দিলে নির্মলা কিছুই বলে না। সে যেন কৈশোরে ফিরে যায়, যে সময় নরেশের এ রকম স্পর্শের জন্য সে উদ্গ্রীব থাকত। এখনও সে নরেশের এই স্পর্শে রোমাঞ্চিত হচ্ছে। এ সময়ে এসে তার এ রকম হওয়ার কথা নয়। সে নিজেই হতবাক হয়ে যায়, কী এমন জাদুর টানে তার শরীরে এমন দোলা বইতে শুরু করেছে? নরেশ তার হাত স্থির রাখতে পারে না। এটা-ওটার ছলে বারবার নির্মলার শরীর ছুঁতে চায়। নির্মলা বোঝে, আর ভেতরের আগুনে দাহ্য হয়। নরেশ তার ডান হাত নির্মলার ঊরুর ওপর রাখে। নির্মলা চোখ বন্ধ করে মাথা ওপরের দিকে করে বসে থাকে। এবার সে আর স্থির থাকতে পারে না। ভেতরে কুণ্ডলী পাকানো কষ্ট মহাপ্লাবন হয়ে তার চোখ দিয়ে ঝরে। আর নরেশকে উদ্দেশ করে বলে, ‘নরেশ দা, ইটা যে পাপ।’
