ইসলামে নারীর মর্যাদা অপরিসীম

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৭
কুরআন মাজীদ কেবল একটি আইন সংকলন নয়। কুরআন মজীদের বক্তব্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণবিহীন কতগুলো সূক্ষ্ম আইন-কানুন ও বিধি-বিধান নয়। কুরআন মজীদে যেমন আইন-কানুন আছে, তেমনি এতে ইতিহাসও আছে, উপদেশও আছে, সৃষ্টিপ্রকৃতির ব্যাখ্যাও আছে এবং আরো হাজারো বিষয় আছে। কুরআন মাজীদ একদিকে যেমন অনেক বিষয়ে কর্মসম্পাদন সংক্রান্ত আইন-কানুন প্রদান করেছে, অন্যদিকে এর অন্য স্থানে সৃষ্টিলোকের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করেছে। যমীন, আসমানসমূহ, উদ্ভিদরাজি, প্রাণিকুল ও মানুষের সৃষ্টিপ্রকৃতির রহস্য এবং বিভিন্ন ধরনের জীবন, বিভিন্ন ধরনের মৃত্যু, সম্মান, লাঞ্ছনা, উন্নতি-অগ্রগতি, অধঃপতন, সম্পদ ও প্রাচুর্য এবং দারিদ্র্যের রহস্য বর্ণনা করেছে। কুরআন মাজীদ কোনো দর্শনের গ্রন্থ নয়, কিন্তু এ গ্রন্থ বিশ্বজগত, মানুষ ও সমাজ- এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছে। কুরআন স্বীয় অনুসারীদের শুধু আইন শিক্ষা দেয় না এবং শুধু কতগুলো উপদেশ ও নসিহত প্রদান করে না, বরং সৃষ্টি প্রকৃতির ব্যাখ্যা পেশ করে স্বীয় অনুসারীদেরকে বিশেষ চিন্তাপদ্ধতি ও বিশ্বদর্শন শিক্ষা দেয়। সম্পদের মালিকানা, রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা, পারিবারিক অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলামী বিধিবিধানের ভিত্তি হচ্ছে মূলত এই সৃষ্টি প্রকৃতি ও বস্তুজগতেরই ব্যাখ্যা মাত্র। কুরআন মজীদে যেসব বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে তার মধ্যে নারী ও পুরুষের সৃষ্টিপ্রকৃতি অন্যতম। কুরআন এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেনি এবং অর্থহীন কথার ফুলঝুরি ছুটানো যাদের অভ্যাস তাদের জন্যে নারী ও পুরুষ সম্পর্কে মনগড়া দর্শন রচনার এবং ইসলামের নারী-পুরুষ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের উত্স নারীর প্রতি অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টিভঙ্গি বলে দাবী করার জন্যে ময়দান ছেড়ে দেয়নি। ইসলাম বিভিন্নভাবে নারী সম্পর্কে স্বীয় মতামত ব্যক্ত করেছে। আমরা যদি দেখতে চাই যে, কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের সৃষ্টিপ্রকৃতি কী, তাহলে আমাদের জন্যে অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে নারী ও পুরুষের প্রকৃতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার প্রতি দৃষ্টি দেয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। কুরআন মাজীদও এ বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করেনি। আমাদের দেখতে হবে যে, কুরআন মাজীদ নারী ও পুরুষকে এক অভিন্ন সৃষ্টিপ্রকৃতির অধিকারী গণ্য করেছে, নাকি দু’টি ভিন্ন সৃষ্টিপ্রকৃতির অধিকারী মনে করেছে? কুরআন মাজীদ বিভিন্ন আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেছে যে, নারীকে পুরুষের অভিন্ন উত্স থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পুরুষদের প্রকৃতির অভিন্ন প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কুরআন প্রথম মানুষ সম্পর্কে বলেন— তিনি তোমাদের সকলকে এক অভিন্ন নফ্স্ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার জুটিকে তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন (সূরা আন্-নিসা’: ১)। এছাড়া সমস্ত মানুষ সম্পর্কে আল্লাহ্তা’আলা বলেন যে, আল্লাহ্তা’আলা স্বয়ং তোমাদের অভিন্ন উত্স থেকেই তোমাদের জন্যে জুটি সৃষ্টি করেছেন (সূরাহ্ আন্-নিসা’, সূরা আলে ‘ইমরান ও সূরা আর্- রূম্)। কতক ধর্মীয় গ্রন্থে যে বলা হয়েছে, নারীকে পুরুষের সৃষ্টি-উপাদানের তুলনায় নিম্নমানের সৃষ্টি-উপাদান থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা নারীকে যে পরজীবী ও পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গণ্য করা হয়েছে, অথবা যে বলা হয়েছে, প্রথম মানুষের স্ত্রীকে তাঁর শরীরের বাম পাশের একটি অংশ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে—কুরআন মজীদে এ সম্পর্কে কোনো কথাই নেই। কিন্তু এ সত্ত্বেও উত্স ও প্রকৃতি প্রসঙ্গে নারী সম্পর্কে ইসলামে কোনরূপ অবজ্ঞাসূচক মতামত নেই। কুরআন মাজীদ তার প্রচুরসংখ্যক আয়াতে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, পরকালীন পুরস্কার ও আল্লাহ্তা’আলার নৈকট্য নারী বা পুরুষ হওয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং ঈমান ও আমলের সাথে সম্পর্কিত, তা সে ঈমান ও আমল পুরুষেরই হোক বা নারীরই হোক। কুরআন মাজীদ মহান ও পবিত্র পুরুষদের পাশাপাশি মহান ও পবিত্র নারীদের কথাও উল্লেখ করেছে; হযরত আদম (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর স্ত্রী এবং হযরত মূসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর মাতাকে সপ্রশংসভাবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে হযরত নূহ্ (আ.) ও হযরত লূত (আ.)-এর স্ত্রীকে যেমন তাদের স্বামীদের অনুপযোগী স্ত্রী বলে উল্লেখ করেছে, তার পাশাপাশি ফিরাউনের স্ত্রীকে একজন ঘৃণ্য ব্যক্তির কবলে থাকা অবস্থায়ও মহীয়সী মহিলা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ থেকে মনে হয় যেমন কুরআন মাজীদ তার বর্ণিত ঘটনাবলীতে নারী ও পুরুষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চেয়েছে এবং চেয়েছে যে, কাহিনীর মহান ব্যক্তিত্ব বা কেন্দ্রীয় চরিত্র যেন কেবল পুরুষদের মধ্যে সীমিত না থাকে। কুরআন মাজীদ হযরত মূসা (আ.) সম্পর্কে বলেছে: আমরা মূসার মাকে এ মর্মে ওয়াহী করলাম যে, তুমি তোমার শিশুকে দুধ পান করাও এবং যখন তার প্রাণ সম্পর্কে আশঙ্কা করবে তখন তাকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে, আর তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হবে না, কারণ আমরা তাকে ফিরিয়ে আনব। কুরআন মাজীদ হযরত ঈসা (আ.)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আ.) সম্পর্কে বলে: তাঁর বিষয়টা এ পর্যায়ে উপনীত হলো যে, তাঁর ইবাদতের মেহরাবে সব সময় ফেরেশতারা এসে তাঁর সাথে কথা বলতেন এবং তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। আর গায়ব থেকে তাঁর জন্যে রুযী আসত। তাঁর নৈতিক ও আত্মিক মর্যাদা এতই উঁচুতে উপনীত হয়েছিল যে, সমকালীন নবী পর্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি নবীকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। হযরত যাকারিয়া (আ.) হযরত মারইয়ামের সামনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েছিলেন। স্বয়ং ইসলামের ইতিহাসেও পবিত্রতা মর্যাদার বিচারে খুবই উঁচুস্তরে উপনীত হয়েছিলেন এমন নারীর সংখ্যা অনেক। এমন পুুরুষের সংখ্যা খুবই কম যারা মর্যাদার বিচারে হযরত খাদীজাহ্ (রা.)-এর স্তরে উপনীত হতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে হযরত রাসূলে আকরাম (স.) ও হযরত আলী (রা.) ছাড়া কোনো পুরুষই হযরত ফাতেমা (রা.)-এর স্তরে উপনীত হতে পারেননি। হযরত ফাতেমার মর্যাদা ছিল তাঁর সন্তান ও বংশধরদের চেয়ে অনেক উঁচুতে যদিও তাঁরা ছিলেন ইমাম এবং তাঁদের মর্যাদা ছিল হযরত রাসূলে আকরাম (স.) ছাড়া অন্য সমস্ত নবী-রাসূলগণের (আ.) ওপরে। ইসলাম ‘সৃষ্টি থকে মহাসত্য পানে পথপরিক্রমা’র ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্যের প্রবক্তা নয়। ইসলাম যেক্ষেত্রে পার্থক্যের প্রবক্তা তা হচ্ছে ‘মহাসত্য থেকে সৃষ্টি পানে পথপরিক্রমা এবং নবুওয়াতের দায়িত্ব বহন, যে জন্য ইসলাম পুরুষকে অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থানের অধিকারী গণ্য করেছে। নারীর প্রতি অবমাননাকর অপর যে একটি অভিমতের অস্তিত্ব ছিল তা হচ্ছে নারীর সাথে যৌন সংসর্গকে ঘৃণ্য গণ্য করা এবং কৌমার্য ব্রত পালন ও যৌনতা বর্জনকে পবিত্র মনে করা। আমরা যেমন জানি, কোনো কোনো ধর্ম ও আদর্শ যৌন সম্পর্ককে মূলগতভাবেই নোংরা ও ঘৃণ্য কাজ মনে করে। এসব ধর্ম ও মতাদর্শের অনুসারীদের বিশ্বাস হচ্ছে এই যে, কেবল সেই লোকদের পক্ষেই নৈতিক, আত্মিক ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে উঁচুস্তরে উন্নীত হওয়া সম্ভবপর যারা সারা জীবন কৌমার্যব্রত পালন করবে। কিন্তু কুরআন বলেছে—‘হুন্না লিবাসুল্লাকুম অআনতুম লিবাসুল্লাহুন্না’ অর্থাত্ তোমরা স্ত্রীদের পোশাকস্বরূপ ও স্ত্রীরা তোমাদের পোশাকস্বরূপ। এই আয়াত অবশ্যই প্রমাণ করে স্ত্রী সংসর্গ কোনো ঘৃণ্য কাজ নয়।