শাফায়াতের কাণ্ডারী নবী মুহাম্মদ (স.)

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৭
দ্বীনের প্রায় সকল আলেম একমত যে, আকীদা সহীহ্ না হলে ঈমানের কোন দাম নেই। তাহলে সেই মহা গুরুত্বপূর্ণ আকীদা বিষয়টি কি তা ভালো করে বুঝে নেওয়া অতীব জরুরি। বর্তমানে ঈমান ও আকীদা একই বিষয় বলে ধরা হয়, আসলে তা ঠিক নয়। ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস। আর আকীদা শব্দের অর্থ হলো কোন বিষয় সম্বন্ধে সঠিক ও সম্যক ধারণা (Comprehensive concept)। কোন জিনিস কি উদ্দেশ্যে তৈরী করা হয়েছে তা সঠিক ভাবে জানার নামই হলো আকীদা অর্থাত্ ঐ জিনিস সম্পর্কে আকীদা সহীহ্ হওয়া। যদি কোন জিনিসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা ভুল হয় তাহলে ঐ জিনিসের ওপর করা যাবতীয় কাজও ভুল হয়ে যাবে। যেমন একটা গাড়ীকে বানানোর উদ্দেশ্য হলো আপনাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আনা নেওয়া করা। ঐ উদ্দেশ্য পূরণার্থে অর্থাত্ সহজ করার লক্ষ্যে, আরামদায়ক করার লক্ষ্যে এর ভেতরে বসার জন্য নরম গদি বসানো হয়। গান শোনার জন্য ক্যাসেট প্লেয়ার বা সঙ্গীতের ব্যবস্থা করা হয়। গরম বা ঘাম থেকে বাচার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো হয়। এসব ব্যবস্থা দেখে যদি কেউ মনে করে এটা একটা বাড়ী এবং এটাকে বানানো হয়েছে বসবাস করার জন্য, তাহলে ঐ গাড়ী সম্পর্কে তার আকীদা ভুল হয়ে গেল। সুতরাং সেই ব্যক্তি যেহেতু এর আসল উদ্দেশ্য জানে না, সেহেতু সে এই গাড়ি চড়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাবে না, সুতরাং তার গাড়িটি অর্থহীন হয়ে যাবে যদি তা পৃথিবীর সবচাইতে দামী গাড়িও হয়। সুতরাং আমাদের ভাল করে জানা দরকার যে, আল্লাহ আমাদের কেন সৃষ্টি করেছেন, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি, নবী রসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য কি, কেতাব প্রেরণের উদ্দেশ্য কি, জাতি গঠনের উদ্দেশ্য কি, সালাত, সওম, হজ্ব, যাকাত, ইত্যাদি দেওয়ার উদ্দেশ্য কি? এসব বিষয়ের সঠিক উদ্দেশ্য জানা না থাকলে আমল করেও কোন ফল পাওয়া যাবে না। আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো মহানবীর আগমনের উদ্দেশ্য কি? মহান আল্লাহ যুগে যুগে মানব জাতিকে হেদায়াতে আনার জন্য নবী রসূল পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবীগণকেই তওহীদ দিয়ে পাঠিয়েছেন (সূরা -আম্বিয়া-২৫)। নবী রসূল প্রেরণের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নবী ও রসূল হিসাবে পাঠালেন মোহাম্মদ (স.) কে। অন্যান্য নবী ও রসূলগণ এসেছেন যার যার গোত্র ও জাতির জন্য। কিন্ত আখেরী নবী হিসাবে যাকে পাঠানো হলো তার দায়িত্ব হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী। তাঁর পরে কেয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী ও রসূল আসবেন না। তাহলে সমস্ত পৃথিবীর জন্য যে মহমানবকে আল্লাহ পাঠালেন তাঁর দায়িত্ব কি? কাজ কি? আমাদের ভালো করে এই বিষয়টি জেনে নেওয়া দরকার অর্থাত্ এই সম্পর্কে আমাদের আকীদা সহীহ্ করা দরকার, নয় তো তাঁর উম্মত হিসাবে আমাদের দায়িত্ব কি তা আমরা বুঝতে পারবো না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনের অন্তত তিন স্থানে নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন “হেদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে আমি আপন রসূল প্রেরণ করেছি, তিনি যেন এটাকে (হেদায়াত ও সত্যদ্বীনকে) অন্যান্য সমস্ত দীনের ওপর বিজয়ী করেন (সূরা-ফাতাহ: ২৮, সূরা-সফ: ৯, সূরা-তওবা: ৩৩)। এই আয়াতে পরিষ্কার দুটি বিষয় দেখা যায়। প্রথমটি হলো হেদায়াত ও সত্যদ্বীন আর দ্বিতীয়টি হলো অন্যান্য সমস্ত দ্বীনের ওপর এই হেদায়াত ও সত্যদ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করা। তাহলে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মহানবীর ওপর নাজিল করলেন হেদায়াত ও সত্যদ্বীন এবং তাঁকে দায়িত্ব দিলেন এটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। হেদায়াত কি? হেদায়াত শব্দের অর্থ হলো সঠিক পথ নির্দেশনা (Right Direction), মানবজাতি কোন পথে যাবে সে সঠিক পথটিই হলো হেদায়াত। সেটা হলো তওহীদ- লা-ইলাহা-এল্লাল্লাহ, অর্থাত্ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আদেশ, নিষেধ, হুকুম না মানা; এক কথায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। তাহলে হেদায়াত হলো তওহীদ আর সত্যদ্বীন (দ্বীনুল হক) তওহীদের ওপর ভিত্তি করা সত্য জীবন ব্যাবস্থা (আইন কানুন দণ্ডবিধি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি)। সমস্ত পৃথিবীময় সত্যদ্বীন জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার মত এত বিরাট বিশাল কাজ করা একার পক্ষে এবং এক জীবনে সম্ভব নয় এটা সাধারণ জ্ঞান। এই জন্যেই তিনি একটা জাতি গঠন করলেন, যার নাম উম্মতে মোহাম্মদী। মহানবী প্রথমে মহান আল্লাহর থেকে দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েই অর্থাত্ নবুয়াত পেয়েই সাফা পাহাড়ে উঠেই মক্কার বিভিন্ন গোত্রের লোকদের একত্রিত করে বললেন, “হে মানব সকল! তোমরা বল লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ, তোমরা সফল হবে।” এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মক্কার যারা সে দিনের পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত ছিল প্রায় সকলেই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে গেল। তারা বললো, “তাব্বালাকা ইয়া মোহাম্মদ--হে মোহাম্মদ তুমি ধ্বংস হও!” প্রশ্ন হলো তারা কেন এই আহ্বানের প্রতিবাদ করল, মহানবীর ধ্বংস কামনা করল, এই বিষয়টি ভালো ভাবে বুঝে নেওয়ার দরকার আছে। রসূলুল্লাহর সমসাময়িক সময়ে যাদেরকে আমরা কাফের মোশরেক বলে জানি, অর্থাত্ আবু জাহেল, আবু লাহাব, ওতবা, শায়েবা, তাদের ধর্মীয় অবস্থা কিন্তু বর্তমান মুসলিম দাবীদারদের থেকে মোটেই আলাদা নয়। আমাদের মাঝে একটা ভুল ধারণা আছে যে তারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখতো না, আল্লাহকে আল্লাহ বলে মানতো না ইত্যাদি ইত্যাদি। আল্লাহর কোর’আন এবং ইতিহাস কিন্তু বলছে অন্য কথা। ঐ আরবরা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্ত্তা বলে, পালনকারী বলে বিশ্বাস করতো, নামাজ পড়তো, কাবা শরীফকে আল্লাহর ঘর বলে বিশ্বাস করতো, ঐ কাবাকে কেন্দ্র করে বাত্সরিক হজ্ব করতো, কুরবানী করতো, রোযা রাখতো, আল্লাহর নামে কসম করতো, নিজেদেরকে মিল্লাতে ইব্রাহিম বলে দাবী করতো, এমনকি তারা খাত্নাও করতো। (চলবে)