আদিবাসী নারীর ক্ষমতায়নে নিরলস চেষ্টা

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৪
ঝর্ণা পাথাং ছিলেন এনজিও পরিচালিত একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। স্বামী প্রনয় রিছিল কাঠমিস্ত্রী। ততটা সামাজিক মূল্যায়ন ছিল না ঝর্ণার। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। আশপাশের দশ গ্রামের মানুষ তার কথার মূল্য দেয়। গ্রামের মানুষের নানা সমস্যা সমাধানে ও কাজে সিদ্ধান্ত দেন তিনি। কারণ গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গাজিরভিটা ইউনিয়নে আদিবাসী এই নারী সংরক্ষিত আসনে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে বদলে গেছে তার সামাজিক অবস্থান। শুধু ঝর্ণা পাথাং নন, পার্শ্ববর্তী ধোবাউড়া উপজেলার ধোবাউড়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত সদস্য আদিবাসী নারী রুবিনা রংদীর নেতৃত্বে আদিবাসী নারীরা তাদের সামাজিক অবস্থান বদলে নিতে শুরু করেছে। নিজেদের অধিকার ও ক্ষমতায়নে এগিয়ে চলেছেন ময়মনসিংহ জেলার আদিবাসী নারীরা। হালুয়াঘাট উপজেলা সদর থেকে পূর্ব দিকে ৫ কিলোমিটার গেলে সূর্যপূর বাজার। এখানে গাজিরভিটা ইউপি কার্যালয়। সেখান থেকে পাকা রাস্তা হয়ে এক কিলোমিটার, এরপর পায়ে হাঁটার কাঁচা রাস্তা। চারপাশে ফসলের মাঠ, অদূরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, পাহাড়ি এলাকার উঁচু নিচু জমি। সীমান্ত ঘেষাঁ ছোট্ট গ্রাম ঝাঁটাপাড়া। গ্রামের বুক চিড়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদী গুমরিয়া। এ নদীর পাড়ে বিভিন্ন আদিবাসী সমপ্রদায়ের বাস। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল ঝর্ণা পাথাংকে। সরকারের হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় আড়াই শতাধিক শ্রমিক গুমরিয়া নদীর ভাংতি ভরাটে কাজ করছেন। শ্রমিকদের সে কাজের তদারকি করছেন ঝর্ণা পাথাং। শ্রমিকদের অধিকাংশই আদিবাসী নারী। তাদের অনেকেই মাঠে কৃষি কাজ করেন। মাঠে কাজ নেই, বেকার সময়ে ঝর্ণা পাথাংয়ের সহযোগিতায় আপাতত কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ভাতার টাকায় পরিবার পরিজনদের মুখে অন্ন যোগাতে পারছেন তারা। ঝর্ণা পাথাংকে নির্বাচিত করে মানুষ যে ভুল করেননি তার প্রমাণ পাওয়া গেল ঝাঁটাপাড়া গুমরিয়া নদীরপাড় ভাংতি ভরাট প্রকল্পে নিয়োজিত অন্য আদিবাসী নারীদের কাছ থেকে। স্বর্ণালতা রংমা (৪৫) জানান, চারপাশ দিয়ে যে ফসলি জমি তাদের ঘিরে আছে তার এক টুকরোও তাদের নয়। সকাল থেকে বিকাল অবধি মানুষের জমিতে কাজ করে যে মজুরি পান তা দিয়েই ১ ছেলে ৪ মেয়েসহ ৭ জনের সংসার চালান। মজুরি পেতেও তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এ কারণে ছেলে মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পারতেন না। এখন তারা মজুরি বৈষম্যের প্রতিবাদ করছেন। ঝর্ণা পাথাং ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তারা নারীর ন্যায্য পাওনা সম্পর্কে জানতে পারছেন। এখন দুস্থ ভাতা, বিধবা ভাতা, কর্মসংস্থান কর্মসূচি, টিআর, কাবিখা কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে পারছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তারা তাদের অধিকার আদায় করতে পারছেন। ঝাঁটাপাড়া গ্রামের রাধুনি রুরাম (৫০) জানান, এ অঞ্চলের আদিবাসীদের বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে। গ্রামের সালিশ বৈঠকে আদিবাসী নারীদের ডাকা হচ্ছে। ঝর্ণা পাথাং তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রজিনা তুজু (২৭) জানান, আশপাশের আদিবাসী গ্রামের নারীরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেন না। স্কুলে পাঠানোর চেয়ে মাঠে কাজ করলে আয় বাড়বে এমন ধারণা ছিল তাদের। সেই দিন বদলেছে। এখন যে বাড়ির ছেলে মেয়েরা স্কুলে যায় না, সে বাড়ির নারীদের তাদের ছেলে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য উত্সাহিত করেন ঝর্ণা পাথাং। ঝর্ণা পাথাং ও রুবিনা রংদী ময়মনসিংহে প্রথম বারের মত নির্বাচিত আদিবাসী নারী ইউপি সদস্য। পেশায় দুইজনই শিক্ষক। এনজিও ব্র্যাকের প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তারা। ঝর্ণা পাথাং এসএসসি এবং রুবিনা রংদী এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কেন প্রার্থী হতে চাইলেন, জানতে চাইলে রুবিনা রংদী জানান, লেখাপড়া করার ইচ্ছা ছিল। অভাব ও বিয়ের পর বেশি দূর যেতে পারেননি। তবে ছোট বেলা থেকেই মানুষের সেবা করার ইচ্ছা ছিল। ব্র্যাকের স্কুলে চাকরির সুবাদে প্রতিদিন গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে তাদের ছোট ছেলে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর পরামর্শ দিতেন। একদিন হঠাত্ করেই গ্রামের মানুষ তাকে প্রার্থী করার প্রস্তাব দেন। প্রথম দিকে স্বামীর আপত্তি থাকলেও পরে তিনি সহযোগিতা করেছেন। গ্রামের মানুষই তাকে নির্বাচিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আদিবাসী নারীরা সব সময় অবহেলিত। তাই আদিবাসী নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে সংগঠক হয়েছি।’ ঝর্ণা পাথাং বলেন, ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়ে আদিবাসী নারীদের জীবনের অনিশ্চয়তা দূর করতে কাজ করে যাচ্ছি। আদিবাসী নারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অধিকার সচেতন। এ ব্যাপারে হালুয়াঘাট উপজেলার গাজিরভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, একজন আদিবাসী নারী ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় অন্য আদিবাসী নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। আগের চেয়ে আদিবাসী নারীরা ক্ষমতায়নে অনেক বেশি এগিয়েছে। প্রত্যেকটি গ্রামের সালিশ বৈঠকে আদিবাসী নারীদের ডাকা হচ্ছে। সরকারি নানা কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ থাকছে।