সারাদেশে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করুন

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৫
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আপনারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাবেন, মানুষ হত্যা করবেন আর আমরা বসে বসে দেখবো তা হবে না। সরকারের এ সহনশীলতাকে দুর্বলতা মনে করবেন না। আমরা সংঘাত চাই না, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়ও বিশ্বাস করি না। আমরা অনেক ধৈর্য ধরেছি। মানুষের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে মানুষ হত্যা, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, দেশীয় সম্পদ নষ্ট করছে তাদের মোকাবেলায় সারাদেশে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের জন্য ডিসিদের কাছে চিঠি পাঠাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত এই কমিটিতে আলেম, ওলামা, মসজিদের ঈমামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যারা সন্ত্রাস চালাবে তাদের পর্যবেক্ষণ এবং নাম-ঠিকানা শনাক্ত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটিকে সহযোগিতা করবে।’ ৪২ বছর পর একাত্তরের মতো আবারো দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান। বিএনপিকে নয়া পাকিস্তানি দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রীর উদ্দেশে বলেন, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধ করুন। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ ত্যাগ করুন। জামায়াত-শিবিরের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরে যারা এদেশের মানুষকে হত্যা করেছে, নির্যাতন চালিয়েছে তাদের পক্ষ আপনারা কেন নেবেন? ইতিহাস থেকে জেনে নিন তারা অপরাধী এবং অপরাধীদের বিচার হবে এটাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাদের বাঁচানোর জন্য নিজেদের জীবন দিয়ে কী লাভ? প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দেশব্যাপী তাণ্ডব চালাচ্ছে তাদেরও তো ঘর-বাড়ি ও পরিবার রয়েছে। দেশের জনগণ যদি ক্ষেপে গিয়ে তাদের ঘর-বাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালায় তখন কী পরিস্থিতি হবে? শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে অর্ডিন্যান্স জারি করে ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেন। এ সময় অনেকে বিদেশে পালিয়ে যায়। তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। ১১ হাজার সাজাপ্রাপ্ত ছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান লংঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন জিয়াউর রহমান। এরপর তিনি মার্শাল ল’ জারি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেন। সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেন। রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একে একে ধ্বংস করে দেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু মদ ও জুয়ার লাইসেন্স বাতিল করলেও জিয়াউর রহমান তা চালু করেন। মুখে ধর্মের দোহাই দিয়ে সকল বেধর্মী কাজই তারা করেন। এখন আবার একই কাজ তারা করছেন। জায়নামাজে আগুন দিচ্ছেন, জুমার নামাজ শেষ হওয়ার আগেই ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। তারা কী ধরনের মুসলমান যে নামাজ পড়ার ধৈর্যটুকু নেই। পুলিশসহ সারাদেশে মানুষ খুন ও দেশের সম্পদ ক্ষতি করছে। প্রকৃতিও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। হাজার হাজার গাছ তারা কেটে ফেলেছে। প্রকৃতির প্রতিও যেন তারা বৈরী। আর বিরোধী দলীয় নেত্রী এদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তাদের সমর্থন করছেন। খালেদা জিয়া নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী দাবি করেন, আবার স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নেন। এর জবাব কী তিনি জনগণকে দিতে পারবেন? যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার দায়-দায়িত্ব বিরোধী দলীয় নেত্রীকেই নিতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার নির্দেশে জামায়াত-শিবির দেশে তাণ্ডব চালাচ্ছে। খালেদা জিয়া একদিকে তাণ্ডবের নির্দেশ দিচ্ছেন, অন্যদিকে হিন্দু বাড়ি-ঘরে হামলার জন্য সহানুভূতি জানিয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন। সর্প হয়ে দংশন করে, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ছেন। চমত্কার খেলা খেলছেন তিনি। অবশ্য ভারতের রাষ্ট্রপতি দেশে আসায় তিনি এমন বিবৃতি দিয়েছেন। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ বাতিল করায় খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছুদিন আগে তিনি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। বেশ আয়েশ করে পায়েশ খেয়ে এলেন। অথচ দেশে ভারতের রাষ্ট্রপতি আসার পরও দেখা করলেন না। হরতাল দেয় জামায়াত, আর সেই হরতাল পালন করেন খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হলে কীভাবে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে তাদের গাড়িতে লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দেন? বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের তাত্পর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার এই ভাষণটি বাজানো এবং শোনা হয়েছে। সে সময় প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাকে উজ্জীবিত ও সাহস যুগিয়েছে এই ভাষণ। আজো এ ভাষণ আমাদের প্রেরণার উত্স। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। সভায় কবিতা পাঠ করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। মতিয়া চৌধুরী বলেন, জামায়াতের কোন ধর্ম নেই। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তারা ধর্ষণকে জায়েজ করেছিল। জায়নামাজে আগুন দেয়ার মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হয়েছে জামায়াত ইসলামে বিশ্বাস করে না। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চে যারা হরতাল দেয় তারা স্বাধীনতা বিরোধী। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, একাত্তরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যে লড়াই শুরু করেছিলেন তা আজ ১৬ কোটি মানুষের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যেদিন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন সেই ৭ মার্চে হরতাল দেয়ায় প্রমাণিত হয়েছে জামায়াতের পাশাপাশি বিএনপিও এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে মেনে নিতে পারেনি। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আবার ১৫ আগস্ট যাতে না আসে সেজন্য সজাগ থাকতে হবে। মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেয়ায় বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।