দেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যাংক ও বীমাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাকে অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি মো. সবুর খান। তিনি বলেছেন, কিছু দিন যাবত্ হরতাল এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পবিত্র স্থান এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের মত ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশ গভীর সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে হরতালের নাম করে যারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে তাদের দেশের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ডিসিসিআই’র নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সময় তারা এ মন্তব্য করেন। দেশজুড়ে ভাংচুর, গাড়ি পোড়ানো ও হরতালকে নৈরাজ্যকর অভিহিত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা একটা অশুভ উদ্যোগ। এ ধরনের নৈরাজ্য যারা চালাচ্ছে তারা দেশ বিরোধী কাজ (এন্টি বাংলাদেশ মুভমেন্ট) করছে। নৈরাজসৃষ্টিকারী এবং বিশ্বজুড়ে অপপ্রচারকারীদের আমি দেশদ্রোহী বলবো না, তারা দেশের শত্রু। এদের বর্তমান আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া দরকার। তবে বিশ্বজুড়ে যে প্রপাগাণ্ডা চালানো হচ্ছে, ঘটনা ততোটা নয়। ১৫টি জেলায় সহিংসতা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি জেলায় কিছুটা বেশি। তাই এটি দেশের প্রকৃত চিত্র নয় বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
বৈঠকে ডিসিসিআই সভাপতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি সর্ম্পকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসা বাণিজ্য মূলত দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে। অতি সম্প্রতি সারা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় ব্যবসায়ী মহল চরম বিব্রত অবস্থায় রয়েছে। কিছু দিন যাবত্ হরতাল এবং রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পবিত্র স্থান এবং যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের মত ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশ গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে। এ ধরনের সহিংস এবং সাংঘর্ষিক রাজনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশের উন্নয়নকে ব্যাপক হুমকির মুখে ঠেলে দেবে বলে চেম্বার মনে করে। এ অবস্থা চলমান থাকলে দেশ দ্রুত চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আমরা আশা করি সরকার একটি কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হবে। হরতালের মতো কর্মসূচির কারণে যাতে আমাদের রপ্তানি ব্যাহত না হয় সেজন্য যেকোন মূল্যে একে রক্ষা করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আমাদের রেলপথ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। বিদেশে বাজার রক্ষায় যে কোন মূল্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ইতিবাচক রাখতে হবে।
তিনি বলেন, চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় এবার নতুন মাত্রা হিসেবে ব্যাংক, বীমা, এটিএম বুথসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক শো-রুম এমনকি চেম্বার ভবন পর্যন্ত অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের শিকার হয়েছে। এটা এখনই বন্ধ করতে না পারলে রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে এধারা অব্যাহত থাকবে। এটা বেসরকারি খাত এবং অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।
বুধবার অর্থমন্ত্রী খনি থেকে কয়লা উত্তলনের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। গতকাল এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে তুললে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোকসানের আশংকা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, উন্মুক্ত পদ্ধতির ব্যাপারে আমি যা বলেছিলাম তা আমার নিজের মন্তব্য। সরকার যাওয়ার আগে কয়লা উত্তোলনে উন্মুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে কিনা তা সিদ্ধান্ত নেবে। এখনো এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগে দুটি ট্রানজিট রুট নির্মাণ করে দেবে বলে জানান তিনি। এদুটি ট্রানজিট রুটই ভারত-নেপালের জন্য করা হবে। একটা হলো জয়দেবপুর থেকে রংপুর। আরেকটা হলো মংলা থেকে খুলনা পর্যন্ত।
গতকালকের বৈঠকে ডিসিসিআই’র পক্ষ থেকে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার কমানো এবং করের আওতা বাড়িয়ে কর হার হ্রাস করাসহ ৮ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নীতিমালা তৈরির লক্ষ্যে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান। ডিসিসিআই সভাপতি কর হার বৃদ্ধি না করে করের আওতা বৃদ্ধি করে কর প্রদানকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য সুপারিশ করেন।
লিস্টেড কোম্পানির উপর আরোপিত কর্পোরেট কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ১৫ শতাংশে নির্ধারণ করা প্রয়োজন এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির আহবান জানানো হয়। ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি নেসার মাকসুদ খান, সহ-সভাপতি আবসার করিম চৌধুরীসহ পরিচালকরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
