থ্রি আর-এ মনোযোগী হচ্ছে এশিয়া

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ১৫:২২
জঞ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করাটাও জঞ্জাল— এমন মত পোষণকারী লোকের সংখ্যাই এ ধরায় বেশি। বর্জ্য সমস্যা বৈশ্বিক ব্যাপার হলেও ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় এশিয়ায় এর তীব্রতা বেশি। এ প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরের গ্রিন ফিউচার সলিউশানের পরিচালক ইউজেন টে জানিয়েছেন, এশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বর্জ্য হ্রাস এবং পুনর্ব্যবহারই সমস্যা লাঘবের সহজ উপায়। রিসাইক্লিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পরিবেশের ওপর এখনো পড়ে। কাজেই এ চিন্তাটা করা উচিত আবর্জনার পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং পুনর্ব্যবহারের পর। কিন্তু শত চেষ্টার পরেও ডাস্টবিন উপচে পড়তে থাকলে রিসাইক্লিংয়ের বিষয়টি মাথায় না এনে উপায় থাকে না। তার মতের সঙ্গে অবশ্য কিছুটা হলেও অমিল রয়েছে সিঙ্গাপুরের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর ন্যাচার-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমি হো’র। তিনি জানিয়েছেন, রিসাইক্লিংয়ের কথা দেরিতে ভাবা মানেই ক্ষতি ত্বরান্বিত করা। কারণ এর মাধ্যমে কমে আসে কাঁচামালের ব্যবহার; রক্ষা পায় আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। ফলে পরিবেশ দূষণও ঘটে কম। রিসাইক্লিংয়ের সুফল অনেক। মাত্র একটি প্লাস্টিক বোতল রিসাইকেল করার সুযোগ দিয়ে আপনি এ পৃথিবীর অনেক উপকার করে ফেলতে পারেন। সবগুলোতে না গিয়ে দুয়েকটির কথাই উল্লেখ করছি। আপনার ব্যবহার করা বোতলটি যত্রতত্র ফেলে দিলে শেষমেশ এর ঠিকানা হবে ল্যান্ডফিল (যে স্থানে বিপুল পরিমাণে আবর্জনা মাটি চাপা দেয়া হয়)। আর আপনি হয়তো জানেন না যে, ওই প্লাস্টিকের বোতলটি আগামী ৭০০ বছরেও মাটির সঙ্গে মিশবে না। এছাড়া সম্পূর্ণ একটি নতুন বোতল তৈরি করতে গেলে সামান্য হলেও যে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন হবে, সেটি থেকেও তো পৃথিবীকে স্বস্তি দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেকটি পরিবার যদি তাদের ব্যবহার করা প্রতি দশটি বোতলের একটিকেও রিসাইকেল করতো, তাহলে ৯০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম প্লাস্টিকের চূড়ান্ত ঠিকানা হতো না ল্যান্ডফিল। কাজেই জটিল সমস্যার কথা জানা সত্ত্বেও হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো যুক্তি নেই। সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই বদলে যেতে পারে আমাদের ভবিষ্যত্। আমি হো পরামর্শ দিয়েছেন, রিসাইক্লিংয়ের চেষ্টাটা শুরু করা উচিত ঘর থেকেই। ব্যবহূত ময়লা পানিকে (টয়লেটের পানি নয়) ইচ্ছা করলেই কাজে লাগানো যায় বাগানের কাজে। প্লাস্টিক ছাড়াও রিসাইক্লিংয়ের তালিকায় যুক্ত হতে পারে কাঁচ, কাগজ ও এলুমিনিয়াম। এগুলোর সবই কমিয়ে দেবে কাঁচামালের ভোগ। আপনার আশেপাশে রিসাইক্লিং কর্মসূচি কোথায় চালু রয়েছে, সেটি আগে জেনে নেয়া উচিত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জাতীয়ভাবে এমন উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করেনি। সিঙ্গাপুরে ২০০১ সালে ন্যাশনাল রিসাইকেল কর্মসূচি (এনআরপি) চালুর পর থেকে প্রতিবছরই নাটকীয় উন্নতি ঘটছে। সরকারি কিংবা বেসরকারি অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে বসবাস করা প্রতিটি পরিবারকেই সরবরাহ করা হয়েছে রিসাইক্লিং ব্যাগ। রিসাইকেল করার যোগ্য জিনিসগুলোকে সেই ব্যাগে ভরে ফেলে দিতে বলা হয় প্রতি পাঁচটি ব্লকের জন্য রাখা কেন্দ্র পরিচালিত ডিপজিটরিতে (গচ্ছিত রাখার স্থান)। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এসে সরকারের লোকজন এখান থেকে নিয়ে যায় সবকিছু। ২০০১ সালে এমন কার্যক্রমে পরিবারগুলোর অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। ২০১২ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশে। সিঙ্গাপুরের একমাত্র সেমাকাউ ল্যান্ডফিলটি এখন পূর্ণ হবে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর। ২০০০ সালে যা ধারণা করা হয়েছিলো, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। রিসাইক্লিংয়ের যোগ্য জিনিসগুলো ওখানে কম পড়াতেই এটি সম্ভব হচ্ছে। গর্বের সঙ্গে এ তথ্যটি জানান সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি’র (এনইএ ) পরিচালক ওং সেং এং। তিনি আশা করছেন, ২০১৫ সালের আগেই রিসাইক্লিং কার্যক্রমে অংশগ্রহণের হার শতভাগে পৌঁছবে। সিঙ্গাপুরের তুলনায় এগোতে পারেনি মালয়েশিয়া। পুনর্ব্যবহার উপযোগীকরণে তাদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ৭ শতাংশ। তবে সরকার চাইছে ২০২০ সালের মধ্যে এ হারকে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করতে। ন্যাশনাল সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এবং পাবলিক ক্লিনিং এ্যাক্ট ২০০৭ কার্যকর করতে কড়াকড়ি আরোপের পরিকল্পনা করছে তারা, যাতে করে লোকজন সব বর্জ্যকে একসঙ্গে না ফেলে পদার্থপূর্ণ বর্জ্যগুলোকে আলাদা করে রাখে। আর তখন সেগুলো তাদের কাছ থেকে এসে নিয়ে যাবে নির্দিষ্ট কর্মীরা। এ বিষয়ে এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিছু প্রাইভেট কোম্পানি। গত জুনে রাজধানী কুয়ালালামপুরের কিছু অংশের আবর্জনা সংগ্রহের দায়িত্ব নেয় আলম ফ্লোরা নামক একটি বর্জ্য সংগ্রাহক কোম্পানি। ময়লা সংগ্রহের জন্য তারা প্রত্যেক বাড়িতেই জমা রেখেছে দুটি পাত্র। উদ্দেশ্য— একটিতে ফেলবে জৈব বর্জ্য, যা পাঠিয়ে দেয়া হবে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে, পচিয়ে সার তৈরির জন্য। আর অন্যটিতে ভরবে রিসাইক্লিংয়ের যোগ্য জিনিসপত্র। উল্টোপাল্টা করলে কিংবা একটির সঙ্গে আরেকটি মিশিয়ে ফেললে শাস্তিস্বরূপ ওইদিনের আবর্জনা অসংগৃহীত থেকে যায়। এর ফল অবশ্য ভালোই এসেছে; কমে এসেছে ভুলের সংখ্যা। আলম ফ্লোরার প্রধান নির্বাহী কঠোর হওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে— ফেলে দেয়া জিনিসগুলো সঠিকভাবে আলাদা করা না হলে রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল (থ্রি আর )-এর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার উপযোগীকরণের ব্যাপারে ফিলিপিন্স রয়েছে এখনো প্রারম্ভিক পর্যায়ে। রিসাইক্লিং বিন কেবল চোখে পড়ে মেট্রো ম্যানিলায়। তাও আবার সব জায়গায় নয়। বর্ধিত জনসংখ্যা এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। বাড়ি-বাড়ি ঘুরে ময়লা সংগ্রহ এবং রিসাইকেল করার কাজটিকে তারা যথেষ্ট ব্যয়বহুল ভাবছে। দোষ দেয়া হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থানকেও। দ্বীপপুঞ্জের রাষ্ট্র বলে তাদের পরিবহন খরচ পড়ে যায় অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও বাযু, মাটি ও পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি অপর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের কথা চিন্তা করে রিসাইক্লিং কার্যক্রম জোরদার করা উচিত তাদের। এখন পর্যন্ত আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজটি করে থাকে সে দেশের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা। তাও আবার নিজেদের স্বার্থে এবং ল্যান্ডফিলে ফেলে দেয়ার আগ মুহূর্তে। ফের ব্যবহার করতে পারবে এমন জিনিসগুলোকে তারা নিয়ে আসে নিজেদের ঘরে। বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করছেন যে, শিক্ষার মাধ্যমে রিসাইক্লিংয়ের হার সারাবিশ্বেই বাড়ানো সম্ভব। সে জন্যই সিঙ্গাপুরে বেশ কিছু স্কুলে পাঠ্যসূচীতে রিসাইক্লিং সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমন পরিকল্পনা বয়েছে মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সেরও। কারণ সবাই বুঝে গেছে থ্রি আর-এর গুরুত্ব। সেজন্য শুরুটা করা উচিত স্কুল থেকেই। অল্প বয়সে জাগিয়ে দিতে হবে দায়িত্ববোধকে। তবেই না তারা ভবিষ্যতে পরিচয় দেবে সুনাগরিকের। — আই এইচ টি অনুসরণে