সরকারি ব্যয় বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট সংসদে পেশ করেছে ভারত। দেশটির অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এ বছরের বাজেটে নারীদের নিরাপত্তা ও তাদের শক্তিশালী করতে এক হাজার কোটি রুপির ফান্ড এবং তাদের জন্য একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন। লোকসভায় ৮২তম বাজেট বর্তমান কংগ্রেস জোট সরকারের শেষ বাজেট। আগামি জুন মাসে শেষ হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থবছর। সে হিসাবে আগামী ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের বাংলাদেশের বাজেটও হবে বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ বাজেট।
স্বাভাবিক ভাবে বড় দেশ হওয়ার কারণে আকারেও বড় বাজেট ঘোষণা করেছে ভারত। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেছিলেন, ভারতের এবারের বাজেটে সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানো হবে। কিন্তু তার উল্টোটাই হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাজেটে ব্যয় কমালেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। তবে সংখ্যাতত্ত্বের হিসেব-নিকেষে সাধারণ জনগোষ্ঠির যতটা না আগ্রহ তারচেয়ে বেশি আগ্রহ বাজেটে কোন পণ্যের দাম বাড়বে আর কোন্ পণ্যের দাম কমবে সে বিষয়টির উপর। এবারের বাজেটে ছাড় পাচ্ছেন মধ্যবিত্তরা। ধনীদের এবং বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ করে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনার কথা বলেছেন ভারতীয় অর্থমন্ত্রী। এ বছরের বাজেটে সরকারি ব্যয় ১৬ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে শতকরা ৮ ভাগ। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন রুপি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যা ছিল ১ দশমিক ৯৩ ট্রিলিয়ন রুপি। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে এবং তাদের নিরাপত্তায় এক হাজার কোটি রুপির একটি নির্ভয়া ফান্ড গঠনের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। দেশি যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় ১শ’ মিলিয়ন রুপির বেশি তাদের ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আর বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে আগের ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে কর ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে মধ্যবিত্তদের একাংশকে খুশি করতে ২ হাজার রুপি আয়কর ছাড় দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থাত্ যাদের বছরে আয় ৫ লক্ষ রুপির কম তারা অতিরিক্ত ২ হাজার রুপি কর প্রদানের ছাড় পাবেন। এতে করে ভারতের প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মধ্যবিত্ত সরাসরি উপকৃত হবে। তবে যাদের মাসিক আয় ১ কোটি রুপির বেশি তাদের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর প্রদান করতে হবে।
দাম বৃদ্ধি ও হ্রাস: ভারতের প্রস্তাবিত বাজেটের ফলে যে সব জিনিসের দাম বাড়বে তার মধ্যে ২ হাজার রুপির ওপরে কেনা মোবাইল ফোন, সিগারেট, দামি গাড়ি, বিলাসবহুল মোটর সাইকেল, বিলাসবহুল গাড়ি এসইউভি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল), সেট টপ বক্স, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় আতিথেয়তায় খরচ, মার্বল, ফোন ও সিল্ক প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আর দাম কমবে যে সব জিনিসের তন্মধ্যে হাতে তৈরি কার্পেট, ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড যানবাহন, চামড়া ও চামড়ার তৈরি দ্রব্য, মূল্যবান পাথর, রাইস ব্র্যান তেল, প্রস্তুতকৃত (রেডিমেড) পোশাক উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে সিগারেট কিনতে দিতে হবে ১৮ শতাংশ কর। চামড়া এবং পণ্য শুল্ক আগের চেয়ে কমিয়ে দিতে হবে ৫ শতাংশ। বিলাসবহুল গাড়ির আমদানি কর দিতে হবে ১০০ শতাংশ। বিলাসবহুল মোটর সাইকেল কিনতে দিতে হবে ৭৫ শতাংশ কর। ২ হাজার রুপির বেশি মূল্যের মোবাইলে দিতে হবে ৬ শতাংশ কর। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেল-রেস্তোরাঁয় আতিথেয়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে দিতে হবে অতিরিক্ত কর। তবে, অপরিবর্তিত রয়েছে আবগারি, কাস্টমস শুল্ক ও পরিসেবা কর। এছাড়া, তৈরি পোশাকের কর আগের চেয়ে কমবে।
উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের খাত: উত্থাপিত বাজেটে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪,৯০,৯২৫ লক্ষ কোটি রুপি। ব্যয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখ্যযোগ্য হলো, শিশু কল্যাণ খাতে ৭৭ হাজার ২৩৬ কোটি রুপি, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার খাতে ২০০ কোটি রুপি, প্রতিবন্ধী কল্যাণ দপ্তরে ১১০ কোটি রুপি, শিশু সেবা ও শিক্ষা খাতে ১৭ হাজার ৭০০ কোটি রুপি। এছাড়া, কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ২৭,০৪৯ কোটি রুপি এবং কৃষি বৈচিত্র্যের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০০ কোটি রুপি। কৃষিতে বাড়তি বরাদ্দ রেখে ২৫০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উত্পাদনের আশা করা হচ্ছে। বাজেটে বাণিজ্যিক ঘাটতির পাশাপাশি অতিরিক্ত রাজস্ব ঘাটতিও কমানো হয়েছে। যথা সম্ভব আয় বাড়িয়ে এবং ব্যয় কমিয়ে এবারের অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি রাখা হয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বস্ত্রশিল্প উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ: পশ্চিমা বিশ্বে মন্দার প্রভাব পড়েছে ভারতের বস্ত্রশিল্পে। বাজেটে তাই বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে এই শিল্পে। প্রযুুক্তি উন্নয়ন তহবিল প্রকল্পে বস্ত্রশিল্পের জন্য ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দের লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। মূলত তাঁত যন্ত্রগুলোর দিকেই দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। কাপড় বোনার পুরানো যন্ত্রগুলো সারাতে উদ্যোগ নেয়া হবে। আনা হবে নতুন যন্ত্রও। বিদেশ থেকে যন্ত্র আমদানিতে শুল্কের উপর ছাড় দেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৩-১৪ সালে এই খাতে ২৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে। তাছাড়া বস্ত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি বস্ত্র পার্কের আওতায় আনতে বস্ত্র মন্ত্রণালয়কে ৫০ কোটি রুপি বিনিয়োগ করা হবে। প্রতিটি নির্মিত পার্ককে ১০ কোটি রুপির অতিরিক্ত তহবিলও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৬ শতাংশ সুদের হারে ঋণের ব্যবস্থা থাকছে। এতে করে ১৫ লাখ তাঁতি এবং ১৮০০টি সমবায় সমিতি লাভবান হবে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক ব্যাংক: ভারতের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ‘মহিলা ব্যাঙ্ক’ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম উল্লেখ করেছেন, ‘আজ অনেক ব্যাংকের প্রধান মহিলা। কিন্তু শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য পৃথক কোনও ব্যাঙ্ক নেই। এমন একটা ব্যাংক তৈরি করা যায় না, যেখানে মূলত মহিলা ও মহিলা পরিচালিত ব্যবসা ঋণ পাবে? যে ব্যাংক মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও মহিলাদের রোজগারে সহায়তা করবে? যেখানে অধিকাংশ কর্মী হবেন মহিলা?’ (খবর-আনন্দবাজার)। নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, চলতি বছরেই এই ব্যাংক চালু হয়ে যাবে। প্রাথমিক পুঁজি হিসাবে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন তিনি।
