বিশ্বের মানচিত্রে নামিদামি দেশ হিসেবে জার্মানির নাম সবার কাছে খুবই পরিচিত বা খ্যাত। সেই জার্মানির একটি গ্রামের একটি ক্ষুদ্র ব্যাংকের চিত্র এটি। যেখানে সব ধরনের লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হয় মান্ধাতা আমলের নিয়ম-নীতি অর্থাত্ সব কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে হাতের লেখার মাধ্যমে। আর তা সম্পাদন করত এই ব্যাংকটির একমাত্র ব্যক্তি বা কর্মকর্তা। আমার মতে বিশ্বের এটি একটি অনন্য উদাহরণ। এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হলো দেশটি ব্যাংকিং জগতে একটি বিশাল নাম করা দেশ হলেও তার একটি গ্রামে এখনও ম্যানুয়ালি পদ্ধতি ব্যবহার করে ঐ ব্যাংকের একটি শাখার মাধ্যমে বত্সরে চল্লিশ হাজার ইউরোর কাছাকাছি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। জার্মানির মতো আমরাও এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী ও চাঙ্গা করতে পারি। ইদানীং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাননীয় গভর্নর থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বেশ জোরেশোরে বিভিন্ন মিডিয়ায় লেখালেখি ও আলোচনা করছেন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মূল একটি বিষয় হচ্ছে যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বিশাল টাকা অপ্রদর্শিত অবস্থায় অর্থাত্ কোন আর্থিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত নেই। আরো পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, ঐ টাকাগুলোর তেমন কোন ব্যবহার নেই, যা এদেশের আপামর কৃষক শ্রমিক দিনমজুর এদের কাছে অলস অবস্থায় পড়ে আছে। সেই টাকাগুলো কোন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বা ঐ জাতীয় কোন চ্যানেলের মাধ্যমে সুসংগঠিত করে দেশের অর্থনীতিতে তা যোগ করা, যার মাধ্যমে দেশকে স্বনির্ভর করা। জার্মানির ক্ষুদ্র এক গ্রামের ঘটনাটি তারই সাক্ষ্য বহন করে। আমরাও তো এভাবে আমাদের দেশকে স্বনির্ভরতার দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারি। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি কৃষিভিত্তিক গরিব দেশ হিসাবে পরিচিত। এখানে ৬৮ হাজার গ্রাম রয়েছে। শুরুটা আমরা ৬৮টি গ্রাম বা কয়েকটি গ্রামীণ শাখা নিয়ে করতে পারি। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রাথমিকভাবে ঐ গ্রামগুলো নির্বাচন করে সেখানে ১ বত্সরের তদারকিতে এ শাখা খোলার মাধ্যমে ঐ কর্মসূচি চালু করা যায়। এ বিষয়ে ঐ জাতীয় শাখার জন্য নিন্মলিখিত সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের একটি চিত্র নিম্নে দেয়া হলো—
একটি গ্রামীণ শাখার আয়-ব্যয় টাকা
আমানত (প্রাথমিকভাবে) ১,০০,০০০,০০/-
ঋণ বিতরণ (বিভিন্ন রিজার্ভ বাদে) ৮১,২৫,০০০/-
গ্রাহকের সংখ্যা ৬০–জনপ্রতি গড়ে
১,২৫,০০০ টাকা
শাখার মোট বাত্সরিক আয় হিসাব ৮,১২,৫০০/-
৮১,২৫,০০০@১০% (সুদের হার)
বাত্সরিক ব্যয়ের হিসাব (আমানত ৬,০০,০০০/-
সুদ বাবদ) ১,০০,০০০,০০@৬%
১ জনের বেতন ১০০০০–১২ ১,২০,০০০/-
ভবন ভাড়া ১০০০–১২ ১২,০০০/-
জ্বালানি ৫০০–১২ ৬,০০০/-
কাগজপত্র ও অন্যান্য খরচ ৩০০০–১২ ৩৬,০০০/-
মোট বাত্সরিক খরচ ৭,৭৪,০০০/-
মোট লাভ ৮,১২,৫০০-৭,৭৪,০০০=২৬,০০০/- (১ম বত্সর)
যদি প্রাথমিকভাবে ৬৮টি শাখা খোলা হয় তবে ঐ শাখাগুলোর লাভ হবে ৬৮–২৬,০০০=১৭,৬৮,০০০/- টাকা
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রাথমিকভাবে কোন কোন শাখায় ঐ টার্গেটের চেয়ে বেশি লাভ করতে পারে, তবে নতুন শাখা হিসেবে বেশিরভাগ শাখা প্রথম দিকে লোকসানের ঝুঁকিতেও থাকতে পারে। তবে কাজটি করলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে তা বলা যেতে পারে। কারণগুলো নিম্নে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।
১। কৃষিজাত পণ্য উত্পাদন অধিকহারে বেড়ে যাবে।
২। দেশের খাদ্য ঘাটতি বহুগুণে হ্রাস পাবে।
৩। দেশের বেকার সমস্যা বহুলাংশে কমে যাবে।
৪। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বহুলাংশে বেড়ে যাবে।
৫। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াকরণে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হবে।
৬। দেশের গরিব অর্থাত্ গ্রামীণ জনপদের অব্যবহূত অর্থগুলো দেশের অর্থনীতির উন্নতিতে যোগ হবে।
৭। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে।
৮। এই প্রকল্প সাফল্য লাভ করলে দেশ স্বনির্ভর হবে।
সর্বোপরি একথা বলা যায় যে, শুরুটা ঐ ৬৮টি শাখা দিয়ে ইউনিট ব্যাংকিং-এর ন্যায় শুরু করা যেতে পারে এবং এরপর বাংলাদেশের ৮৬,০০০ গ্রামের জন্য ৬৮,০০০ এই জাতীয় ইউনিক ব্যাংকের ধারণা নিয়ে কাজটা শেষ হতে পারে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, অনেকেই বলবেন জার্মানি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে একটি নামকরা দেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশ একটি অনুন্নত দেশ হিসাবে পরিচিত। সেক্ষেত্রে জার্মানির উদাহরণ এ দেশে চলে না। হয়তো তাদের মতের সাথে আমিও দ্বিমত পোষণ করবো না। তবে এই জাতীয় উদ্যোগের একটি চেষ্টা ছোট আকারের হলেও আমাদের দেশে নেয়া যেতে পারে। কারণ আবারও বলছি, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি/যোগ এটা সময়ের দাবি। সে কারণেও গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করতে এমন একটি উদ্যোগ তো নেয়াই যেতে পারে।
