শিশুর কানব্যথা যখন ঝুঁকিপূর্ণ

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ১৫:৩৬
হঠাত্ কানব্যথা। তবে একটু সর্দি-কাশি ২/৩ দিন ধরেই ছিল। হঠাত্ কানব্যথার এই সমস্যা প্রথম থেকেই তীব্র হতে পারে কিংবা প্রথমে অল্প হয়ে ক্রমশ বাড়তে পারে। অনেক শিশু-কিশোরদেরই এ রকম অবস্থা দেখা দেয়। কানব্যথার এই সমস্যা আক্রান্তের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে এটিকে মেডিকেল ইমারজেন্সি বা জরুরি চিকিত্সাযোগ্য রোগ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কানের এই জরুরি সমস্যার- মধ্যকর্ণের তীব্র চিকিত্সা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম- একিউট সাপোরেটিভ ওটাইটিস মিডিয়া। সাধারণভাবে শিশুরা এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। বারবার উর্ধ্বশ্বাসনালীর প্রদাহ হচ্ছে এই ইনফেকশনের অন্যতম কারণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উর্ধ্বশ্বাসনালীর এই ইনফেকশন ভাইরাসজনিত সংক্রমণের জন্যই হয়ে থাকে। যেসব শিশুরা ঘনঘন সর্দিকাশিতে ভোগে এবং টনসিল এবং এডিনয়েড (নাসা গলবিল বা ন্যাসোফ্যারিংস এর টনসিল) এর সমস্যা রয়েছে তাদের মধ্যেই এর প্রকোপ বেশি। এই সমস্যায় মধ্যকর্ণের সঙ্গে উধর্ব শ্বাসনালীর যোগাযোগ রক্ষাকারী একটি নালী হয়ে ইনফেকশন কানে পৌঁছে যায় কিংবা নালিটি বন্ধ হয়ে পর্যায়ক্রমে মধ্যকর্ণে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে মধ্যকর্ণের সঙ্গে উর্ধ্বশ্বাসনালীর যোগাযোগ রক্ষাকারী নালীটি দৈর্ঘ্যে কিছুটা ছোট ও মোটা থাকে এবং এর অবস্থান কিছুটা সমান্তরাল। ফলে উর্ধ্বশ্বাসনালীর কোন ইনফেকশন সহজেই প্রবেশ করতে পারে মধ্যকর্ণে। একইসাথে শিশুদের মধ্যকর্ণের এই ইনফেকশন ছোট্ট শিশুকে একদম চিত্ করে শুইয়ে দুধ কিংবা অন্য কোন তরল খাওয়ানোর কারণেও হতে পারে। চিত্ করে খাওয়ানোর কারণে তরল খাবার কিংবা দুধ শিশুর মুখ দিয়ে সহজেই সেই নালি হয়ে মধ্যকর্ণে ঢুকে পড়তে পারে। মধ্যকর্ণের ইনফেকশন তীব্র হওয়ার কারণ হল প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই এর জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার একটা সম্পৃক্ততা থাকে। ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন হয়ে কানের মধ্যে পুঁজের সৃষ্টি হয়। মধ্যকর্ণের এই ইনফেকশন হঠাত্ করেই দেখা দেয়। তীব্র কান ব্যথা দিয়েও শুরু হতে পারে। আবার হালকা কানব্যথা দিয়েও শুরু হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কান দিয়ে কোন কিছু বের হয় না। অর্থাত্ কান দিয়ে পুঁজ পানি কিংবা ময়লা কোন কিছুই বের হয় না। এই ধরণের সমস্যায় অনেক বাবা মাকেই বলতে শোনা যায়, কাল সারারাত ব্যথায় বাচ্চা একদম ঘুমাতে পারেনি। কিন্তু রাতের পর সকাল বেলা ব্যথা কমে যায় না। মধ্যকর্ণের তীব্র প্রদাহের উপসর্গ ও লক্ষণগুলো নির্ভর করে রোগটি কোন পর্যায়ে আছে তার ওপর। একদম প্রথম অবস্থায় যখন ইউস্টেসিয়ান টিউবটি বন্ধ হয়ে যায় তখন কানে কম শোনা এবং কানব্যথা এই দুটি উপসর্গই অনুভব করা যায়। যদি ইউস্টেসিয়ান টিউবটি বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকে তখন মধ্যকর্ণে ব্যাকটেরিয়ার অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে বেড়ে যায় কানব্যথা। কান টনটন করে ব্যথা করে, জ্বর থাকতে পারে। কানের মধ্যে পুঁজ হওযার কারণে কানের পর্দাটি ফুটো হয়ে যেতে পারে। পর্দা ফুটো হয়ে গেলে কান দিয়ে পুঁজ কিংবা পানির মত কিছু গড়িয়ে বেরিয়ে আসে। অনেক সময় এই কান দিয়ে বেরিয়ে আসা পুঁজ-পানি রক্তমিশ্রিত থাকতে পারে। কান দিয়ে পুঁজ-পানি বেরিয়ে আসার পর কানের ব্যথা দ্রুত কমে যায়। সেইসঙ্গে কমে যায় জ্বরও। শিশুর মধ্যে একধরনের স্বস্ত্বি ফিরে আসে। মধ্যকর্ণের এই ইনফেকশন ধারাবাহিক এই পরিণতিতে না যেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে জটিলতার উপসর্গ নিয়ে আর্বিভূত হতে পারে। জটিলতার কারণে মধ্যকর্ণের বাইরের হাড়ে ইনফেকশন ছড়িয়ে যেতে পারে। হাড়ের মধ্যে পুঁজ জমতে পারে। এই পুঁজের কারণে কানের পিছনের অংশ ব্যথাযুক্ত হয়ে ফুলে উঠতে পারে। মধ্যকর্ণের হাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ফেসিয়াল নার্ভটি ওপর পুেঁজর চাপের কারণে নার্ভটির কার্যক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে, তখন নার্ভ দুর্বলতার উপসর্গ হিসাবে মুখ বেঁকে যেতে পারে, চোখের পাতা কিছুটা অসাড় হয়ে চোখের ওপর আধবোজা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে। এছাড়া অনেক মারাত্মক ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে জটিলতার জন্য। ব্যথার শুরুতে অনেকেই শিশুকে প্যারাসিটামল কিংবা অন্যান্য ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে থাকেন। এতে ব্যথা হয়ত কিছুটা কমে যায় তাই সকালবেলা ব্যথা একটু কম অনুভূত হয়। তবে কানে এ ধরণের কোন ব্যথা হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণ কান পর্যবেক্ষণ না করে এই রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব নয় এবং পরামর্শ গ্রহণে দেরী হলে ততক্ষণে মধ্যকর্ণের ইনফেকশন তীব্রতর হয়ে কানের পর্দাকে ছিদ্র করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেয়ার পরিণামে কানের পর্দাটি ছিদ্র হয়ে যেতে পারে। যদিও সঠিক সময়ের চিকিত্সায় কানের পর্দার সেই ছিদ্র সেরে ওঠে বা জোড়া লেগে যায় কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পর্দার ছিদ্রটি স্থায়ীভাবে রয়ে যেতে পারে। এবং এক পর্যায়ে শিশুটি দীর্ঘমেয়াদী কানপাকা রোগীতে পরিণত হয়। সুতরাং যাবতীয় জটিলতা এড়াতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিত্সা শুরু করতে হবে এবং এর কারণ খুঁজে বের করে সেটির ও স্থায়ী চিকিত্সা করতে হবে।