যমুনাপাড়ের নারীদের দিন বদলের গল্প

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ১৫:৩৯
এক সময় ভাতের অভাবে মরতে ইচ্ছে করত। কিন্তু, এখন আমি রোজগার করি। প্রয়োজন মত খরচও করতে পারি। কারো কাছে হাত পাততে হয় না। বরং স্বামী ও সংসারের প্রয়োজনে আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারছি। এতে করে সংসারে আমার মতামতেরও গুরুত্ব বেড়েছে। একথাগুলো বলেন- সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার কোণাবাড়ী চরের আমজাদ হোসেনের স্ত্রী শাহিনুর খাতুন । নারীর নরম কোমল যে হাতে মেহেদী রঙ আর রঙিন চুড়ি শোভা পাওয়ার কথা সেই কোমল হাতে এখন এভাবেই বোনা হয় তাঁত। সংসারে স্বাবলম্বী হতে পুরুষের পাশাপাশি তাদের এই চিরন্তন সংগ্রাম। নারী-পুরুষের ভেদাভেদ না করে তারা এই কাজকে গ্রহণ করেছে পেশা হিসেবে। ইতিমধ্যেই ওদের অনেকে বিজয়ী হয়েছে, ছিনিয়ে এনেছে সফলতার সূূর্য। হয়েছে আত্মনির্ভরশীল। এক সময় পুরুষ মানুষেরা তাঁত বোনার কাজ করত। আর মেয়েরা চরকায় সুতা কাটত। কিন্তু, এখন আর সে দিন নেই। পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও তাঁত বোনার কাজ করছে। ঘরে বসেই তৈরি করছে শাড়ি, লুঙ্গি এবং গামছা। ফলে সংসারে বাড়তি আয় হচ্ছে। ক্রমশ: দূর হচ্ছে তাদের দুঃসহ যন্ত্রণাদগ্ধ অভাবী জীবনের অভিশপ্ত কালো বিড়াল। সিরাজগঞ্জ কোণাবাড়ী গ্রামের বন্যা ও নদীভাঙ্গন কবলিত দরিদ্র ও অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের এই সুযোগ করে দিয়েছে প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন, বাংলাদেশ নামক একটি বেসরকারি সংগঠন। এনজিওটির পক্ষ থেকে ভিটুআর প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ জন দঃস্থ, অসহায় ও অতিদরিদ্র মহিলাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিজনকে সরবরাহ করা হয়েছে একটি করে তাঁত। প্রথমে ১০ দিন ও পরে আরো প্রায় দেড় মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নিজ বাড়িতে তাঁত শিল্প স্থাপন করে নিজ হাতেই তা পরিচালনা করছেন। ফলে প্রতিদিন একজন মহিলা তাঁতি আয় করছেন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা এবং মাসে আয় করছেন কমপক্ষে ৪৫০০ টাকা। বিভিন্ন স্থান থেকে মহাজনরা এসে তাদের উত্পাদিত পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে কামারখন্দ ও বেলকুচি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা গেছে জেলার সবচেয়ে শীর্ষ স্থানীয় সংস্থা এনডিপি বিগত ২ যুগ ধরে জেলার শত শত মহিলাদের অনুরূপ প্রশিক্ষণ দিয়ে অগণিত ক্ষুদ্র নারী শিল্পোদ্যাক্তা তৈরিতে সফল হয়েছে। শুধু কামারখন্দের পাইকশা বাজারে জীবন সংগ্রামে জয়ী এমন শতাধিক নারী উদ্যোক্তার সাফল্যগাঁথা ঘটনা দেখতে পাওয়া গেল। সংসারের কাজের ফাঁকে তারা তাঁত বুনে বাড়তি আয় করছেন, যা তাদের ছেলে মেয়ের লেখাপড়া করার খরচ জমানোসহ অন্যান্য কাজে লাগছে। ইতিমধ্যেই তাঁতের কাজ করে অনেকেই তাদের ভাগ্য ফিরিয়েছে। ঘুচিয়েছেন দুঃখ। জানা গেছে জেলার চরাঞ্চল ও তৃণমূল গ্রামাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়নে জেলার উল্লেখযোগ্য বেসরকারি সংস্থা সমূহ এনডিপি,মানব মুক্তি সংস্থা, গণকল্যাণ সংস্থা, শার্প,দীপশিখাসহ বেশ কয়েকটি এনজিও সংস্থা কাজ করে চলেছেন। এ প্রসঙ্গে জেলার সবচেয়ে শীর্ষ স্থানীয় এনজিও এনডিপির পরিচালক আলাউদ্দিন খান বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মহিলা উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে আমরা বিগত ২ যুগ ধরে নানা ধরনের কাজ করে চলেছি। বেলকুচি ও কামারখন্দ এলাকাতেই প্রায় সহস্রাধিক নারী উদ্যোক্তা তৈরি করে একদিকে যেমন কুটির শিল্পের উত্পাদনের তারা অবদান রাখছেন। ঠিক সেই সাথে অভাবী আর দারিদ্র্য ক্লিষ্ট জীবনের পরিবর্তে শত শত পরিবার এখন স্বচ্ছল ও স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে মাখা উঁচু করে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পেয়েছে। প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন, বাংলাদেশ-এর ভিটুআর প্রকল্পের সিরাজগঞ্জ অফিসের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো: আশরাফ উদ্দিন বলেন-তারা মূলত: চাহিদার উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং সেই অনুযায়ী নারীদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেন। এতে করে দেশের বেকার সমস্যা দূরীভূত হচ্ছে।