মাস যায়, বছর যায় শুধু প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের বাণী। সরকার যায়, সরকার আসে কেউ কথা রাখে না। আজো পানির ন্যায্য হিস্যা মিলেনি। শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যায় তিস্তা। নদীতে চলে ঘোড়ার গাড়ি। হাজার বছর ধরে যে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের মানববসতি ও সভ্যতা, ভাটিয়ালী আর ভাওয়াইয়া গান, সেই চিরযৌবনা প্রমত্তা তিস্তা ক্রমাগত ক্ষীণ হয়ে মরে যাচ্ছে। তার বুক জুড়ে স্রোত আর নেই। হিমালয়ের তুষার গলা পানি আর বৃষ্টি ধারায় তিস্তার জল যতই বেড়ে উঠুক, এখন তা মানুষের হাতে বন্দি। তিস্তার বুক জুড়ে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। উজানে ভারত ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার প্রাকৃতিক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের ১১২ মাইল দীর্ঘ এই নদী শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। এই নদীর ওপর নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার ডালিয়া ও দোয়ানীতে নির্মিত তিস্তা ব্যারেজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলে কৃষি জমিতে যে সেচ দেয়ার কথা তাও প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশগত ও নৌ-যোগাযোগ ক্ষেত্রে। প্রকৃতি ক্রমশ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। ফলে এই তিস্তা নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে পানির স্তর নিম্নমুখী হচ্ছে।
নদী গবেষক ও রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী সূত্রে জানা গেছে, উজানে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজল ডোবায় ব্যারেজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি মহানন্দা নদীতে নেয়া হচ্ছে। এই সংযোগ খাল থেকে তারা জলপাইগুড়ি জেলা, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর মালদহ ও কোচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে। এ অবস্থায় ১৯৭৭ সালে তিস্তা নদীর ওপর ব্যারেজ, হেড রেগুলেটর ও ক্লোজার ড্যাম তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার।
এ বিষয়টি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নজরে গেলে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা নামক স্থানে (বাংলাদেশ থেকে ৬৩ কি. মি. উজানে) ৯২১ দশমিক ৫৩ মিটার দীর্ঘ ব্যারেজ নির্মাণ করে। এই ব্যারেজটির মাধ্যমে ভারত তিস্তার মোট পানি প্রবাহের ৮০ শতাংশ পানি তিস্তা-মহানন্দা ক্যানেলের মাধ্যমে জলপাইগুড়ি জেলা, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর মালদহ ও কুচবিহার জেলার কৃষি জমিতে সেচ প্রদান করছে। উদ্বৃত্ত ২০ শতাংশ পানি ভারত ভাটিতে ছাড়লেও ৬৩ কি. মি. পথ অতিক্রম করে এই স্রোতধারা বাংলাদেশের দোয়ানীতে ব্যারেজ এলাকায় একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যায়। ফলে ভাটিতে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। ছোট বড় শতাধিক খেয়াঘাট ও চিলমারীর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে ভাসমান তেল ডিপো ইতিমধ্যেই কয়েকদফা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নৌ-যোগাযোগের ক্ষেত্রে মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জায়গায় শ্যালো মেশিন দিয়ে অল্প পানি বের হচ্ছে। এ কারণে সেচ কাজে বিঘ্ন ঘটছে। তিস্তা রেলসেতুর নিচে পানি না থাকায় সেখানে চাষাবাদ করা হচ্ছে। এর উজানে গঙ্গাচড়ার মহিপুর গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়া, জয়নাল, মজিবর ঘাটিয়াল এরা পেশায় সবাই মত্স্যজীবী। নিজেদের ভিটেমাটি নেই। তাদের ভাষায়, গত ডিসেম্বর মাস থেকে তারা বলতে গেলে বেকার। নদীতে পানি না থাকায় মাছ মিলছে না। তাই তারা এখন পেশা বদল করে জীবিকা চালাচ্ছে। কাজের সন্ধানে ছুটছে দক্ষিণাঞ্চলে ও ঢাকা শহরে। আর যারা কৃষক পরিবার তারা বেজায় খুশি কারণ জেগে ওঠা চরে চাষাবাদ করে তারা ফসল ফলাচ্ছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবর রহমান প্রামাণিক বলেন, বন্যার সময় প্রতি বছর উজান থেকে পানির সাথে বালু আসার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। তিস্তায় এখন হাঁটু পানি। এ অবস্থায় নদীটি ড্রেজিং করা হলে এলাকার কৃষকরা সেচ সুবিধা পেত। সেই সাথে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পেত। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
