গম্ভীরা গানের মতো বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী ও নিজস্ব লোকসংগীত ‘আলকাপ’। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গম্ভীরার চর্চা এখানে এখন পর্যন্ত কিছুটা হলেও আলকাপের চর্চা এখন একেবারে নেই বললেই চলে। এমনকি বর্তমান প্রজন্মসহ শহুরে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও জানেন না আলকাপ গান কী? অথচ নাচ-গান, বন্দনা-ছড়া, নাটকীয়পালাসহ নানা আয়োজনে সমৃদ্ধ এরকম লোকসংগীত বাংলাদেশে খুব কমই চোখে পড়ে।
‘আলকাপ’ একটি আরবি শব্দ—যার বাংলা অর্থ হচ্ছে মস্করা, ঢং বা কৌতুক। এটি এক প্রকার পালাগান বা অন্য অর্থে লোকনাট্য। উনিশ শতকের প্রথমদিকে আলকাপ গানের চর্চা শুরু হলেও বিশ শতকের গোড়ার দিকে গৌড়ীয় অঞ্চলে আলকাপের একটি উল্লেখযোগ্য বিকাশ লক্ষ করা যায়। আর আলকাপ গান তখন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে জনপ্রিয় ও পেশা হিসেবেও বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছিল। আগের দিনে সাধারণত পূজা-পার্বণ, নবান্ন-অন্নপ্রাসন, বিয়েবাড়ি, বৈশাখীমেলা উপলক্ষে আলকাপ গানের আয়োজন করা হতো। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আলকাপ শিল্পীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার চার শ উনিশ জন। বর্তমানে যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র এক শ বাহান্ন জনে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগ শিল্পীই অনিয়মিত।
আলকাপ গানের আসরে দর্শক-শ্রোতারা মাঝখানে কিছু জায়গা ফাঁকা রাখে। আগের দিনে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আলোর উত্স হিসেবে আলকাপ গানে ব্যবহার করা হতো হেচাক লাইট। আলকাপ গানের আসর চলাকালে বাদ্যযন্ত্রী, দোহার, অংশগ্রহণকারী কলা-কুশলী, সরকার (আলকাপ রচয়িতা), ছাকরা এবং লাবাড়া (জোকার) গোল হয়ে বসেন। আর তাঁদের বসার পরে মাঝের ফাঁকা গোলাকার জায়গাটুকু হচ্ছে আলকাপের মঞ্চ। আর এ মঞ্চেই চলে নাচ, গান ও অভিনয়। চরিত্র অনুযায়ী অভিনয়ের সময় দাঁড়িয়ে অভিনেতারা অভিনয় নৈপুণ্য প্রদর্শন করে থাকেন। আগমন-নির্গমন,পদচারণা, ছোকরার নাচ সবকিছুই একই স্থানে হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, আলকাপ গানে কোনো নারী অংশগ্রহণ করেন না। পুরুষদের মধ্য থেকে সুন্দর ও মিষ্টি চেহারার অল্প বয়সী কেউ মেয়েদের পোশাক পরে ছোকরা সেজে নারীর অভিনয় করে। অভিনেতা, ছোকরা ও সরকার ছাড়াও আলকাপ গানে একজন হারমোনিয়াম বাদক, তিন-চার জন জুড়িবাদক, একজন তবলাবাদক, এক থেকে দুইজন জোকারসহ আরও ছয়-সাত শিল্পী অংশগ্রহণ করেন। আলকাপ গানের মূলে থাকে ছয়টি অংশ। এগুলো হলো— জয়, আসর বন্দনা , দেশ বন্দনা ও অন্যান্য ছড়া, খ্যামটা, ফার্স বা দ্বৈত সংগীত এবং আলকাপ পালা। আলকাপ গানের সূচনাতেই যন্ত্রসহযোগে মিউজিক বাজানো হয়। একে ‘গদ’ নামে অভিহিত করা হয়। এর পরপরই সমবেত কণ্ঠে দলের সরকার, দেবী সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক প্রমুখের নামে ‘জয়’ দেওয়া হয়। যেমন— ‘সরস্বতী দেবী কি জয়...’ ইত্যাদি। আর বন্দনা আলকাপ গানে তার জন্মলগ্ন থেকেই রয়েছে। এসব বন্দনা হচ্ছে শিব বন্দনা, গণেশ বন্দনা, কার্তিক বন্দনা প্রভৃতি। বন্দনার পর সরকার দাঁড়িয়ে দেশবন্দনা ও ছড়াবন্দনা পরিবেশন করে থাকেন। দেশবন্দনার পর যন্ত্রে প্রথমে খ্যামটার সুর বাজানো হয়। খ্যামটার সুর অনুসরণ করে ছোকরা নৃত্য ও গান পরিবেশন করতে থাকে এবং এ নাচ-গান দর্শক-শ্রোতাকে অভিভূত করে তোলে। প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে দুজন শিল্পী ফার্স বা দ্বৈত গান পরিবেশন করে থাকেন। ছোকরার নৃত্য শেষ হলে একজন গায়ক বন্দনা ছড়া পরিবেশন করেন। আর এ ছড়া শেষ হলেই শুরু হয় অভিনয়সহ আলকাপ পালা। আলকাপ পালায় সাধারণত সমাজ ও পারিবারিক জীবনের চিত্র প্রতিফলিত হয়ে থাকে। আলকাপ গান বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রচিত হয়ে থাকে। যেমন: ঐতিহাসিক বিষয় সম্পর্কিত আলকাপ (যেমন: কৃষক আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ); সমাজ সমস্যামূলক আলকাপ (যেমন: যৌতুক, মাদক, দুর্নীতি); ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কিত আলকাপ (যেমন: মুহররমের বিয়োগান্তক ঘটনা, মনসা-চণ্ডীর কাহিনি); শিল্প সম্পর্কিত আলকাপ (যেমন: রেশমশিল্প, কুটিরশিল্পের বর্ণনা), ব্যক্তি পরিচিতিমূলক আলকাপ (যেমন: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ)।
আলকাপ গানের অবলুপ্তির কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের ফলে বহু উচ্চবর্ণ ও বিত্তের এবং নিম্নবর্ণ ও বিত্তের হিন্দুদের (যারা বিভিন্নভাবে আলকাপ গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল) এ দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যাওয়া, পেশা হিসেবে আলকাপ শিল্পীদের পারিশ্রমিক অতি নগণ্য এবং তা অলাভজনক হওয়া, বিভিন্ন দলে সরকারদের শিল্পী ও ছোকরা নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রভৃতি। তাছাড়া সময়ের সঙ্গে জনগণের রুচিবোধের পরিবর্তন, সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ গানের রক্ষণাবেক্ষণ ও উত্কর্ষের ক্ষেত্রে পৃষ্টপোষকতার যথেষ্ট অভাব, দ্রুত নগরায়নের বিকাশ ঘটাসহ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার লাভ করার ঘটনা আলকাপ গানের অবলুপ্তির অন্যতম কারণ ।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অবলুপ্তপ্রায় লোকসংগীত আলকাপ গানকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে একে সংগ্রহ ও যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে এ গান বাংলাদেশের লোকসাহিত্যর বৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাছাড়া ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র মতো সারা পৃথিবীর লোকসংগীতপ্রিয় গবেষকদের দৃষ্টি নন্দিত হবে এবং এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী এ লোকসংগীতটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাসহ প্রয়োজন সকলের আন্তরিক প্রয়াস, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন।
ঢাকা
