প্রকল্প অনুমোদনে অস্বাভাবিক বিলম্ব বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারিভাবে পরিচালিত এক সমীক্ষায় এই তথ্য ফুটে উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশন গত বছর ১০০টি প্রকল্পের ওপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। তাতে দেখা যায়, এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য গৃহীত প্রকল্পসমূহের অনুমোদনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিনগুণ সময় বেশি লেগেছে। ফলে বাস্তবায়ন কাজ শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে। আবার অনুমোদনের অনুপস্থিতিতে প্রকল্পের অনুকূলে অর্থ ছাড়েও বিলম্ব হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও এজেন্সিতে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উপযোগী কাঠামো না থাকায় প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব হয়ে থাকে; এর ফল এডিপি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, গত ২৩ থেকে ২৬ ডিসেম্বর এডিপি সংশোধনের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রাথমিকভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি তিন হাজার কোটি টাকা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি ২৪ শতাংশ বাস্তবায়িত হওয়ায় বাকি সাত মাসে বাদ বাকি ৭৬ ভাগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকায় এ ক্ষেত্রে কাটছাঁটের কথা ভাবা হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে দেশবাসীর সরাসরি স্বার্থ জড়িত। অর্থবছরের জন্য দেড় লাখ কোটি টাকার যে বাজেট তৈরি করা হয় তাতে জনগণের প্রাপ্তি হলো সর্বসাকুল্যে এই বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি)। এর যথাযথ বাস্তবায়নের পর সাধারণ মানুষের কল্যাণ জড়িত। তাদের ভাগ্যোন্নয়নও সংশ্লিষ্ট। দুর্ভাগ্যজনক হলো এডিপি বাস্তবায়নে অতীতের প্রতিটি সরকারই যথেচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে। এডিপির এক বড় অংশ কাটছাঁট সাংবার্ষিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকার আমলে এডিপির আকার এবং বাস্তবায়নের গতি দুই-ই বৃদ্ধি পেলেও তাতে আত্মপ্রসাদের অবকাশ থাকা উচিত নয়। জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বা তাদের উন্নয়নের কাজে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সঠিকভাবে ব্যয় হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবারই লক্ষ থাকা উচিত। আমাদের বিশ্বাস, এডিপি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে জনচাহিদার দিকে সবিশেষ নজর রাখা হবে। বাস্তবতার খাতিরে কাটছাঁটের পর যে এডিপি থাকবে, তার বাস্তবায়ন যাতে শতভাগ সূচারুভাবে হয় সেদিকে নজর রাখা হবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য বাংলাদেশকে বৈদেশিক সহযোগিতার ওপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হয়। এ দেশকে হাত পাততে হয় বিদেশের কাছে। কিন্তু সেই অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যেসব শর্ত দাতারা আরোপ করে, সেগুলো মেনে চলতে গেলে অহেতুক সময়ক্ষেপণ হয়। পরিণতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিলের বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তার আকার ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দাতাগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে বিদেশি সহায়তায় পরিলক্ষিত হচ্ছে ভাটার টান। এ অবস্থায় বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পগুলোতে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে এর মধ্যেই এডিপি সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়ে চিঠিও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ মারফত জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৪ শতাংশ। অথচ বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে যথাযথভাবে এডিপির বাস্তবায়ন জরুরি ও অপরিহার্য। এর ওপর সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভরশীলও বটে। প্রতিবছর সরকার মহাআড়ম্বরে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে থাকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি। তবে শেষ পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায় লেজেগোবরে অবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ত্রুটি-বিচ্যুতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অদক্ষতা, অবহেলা ও গাফিলতি, সময়মতো অর্থ ছাড় না করা, সর্বোপরি দুর্নীতি-অনিয়ম-অব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে অনেক প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত অথবা অসমাপ্ত থেকে যায়। আবার অর্থবছরের শেষপ্রান্তে এসে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের কাজ শেষ করায় কাজ মানসম্মত হয় না। এ অবস্থায় এডিপির অর্থায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গৃহীত প্রকল্পগুলোয় মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি ও পরিবীক্ষণ আবশ্যক। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার হয়তো এবার এডিপি যথাসম্ভব বাস্তবায়নে আরও সচেষ্ট ও আন্তরিক হবে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় করতে গিয়ে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। ফাইলপত্র চালাচালি করে অর্থ ছাড় করাতে গিয়ে বছর শেষ হয়ে যায়। ফলে কাজ করতে হয় দায়সারা গোছের। এই প্রক্রিয়ার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে যেটুকু কাজ করা হয়, তাও হয় নিম্নমানের। এই সময় প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের সামনে উদ্দেশ্য থাকে স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থ ব্যয় করে ফেলা। কাজ কী হলো, তা দেখার মতো সময় এবং মানসিকতাও থাকে না তাদের। ফলে অর্থ ছাড় করিয়ে আনতে পারলেও প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে সবার আগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করতে হবে, সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ক্রয়নীতি সহজ করতে হবে, দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে, পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
ঢাকা
