নৈতিক অবক্ষয় রোধ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৫
সভ্যতার উত্কর্ষ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ স্রষ্টার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে উঠেছে ক্রমশ যুক্তিবাদী ও পরিশীলিত—একথা সর্বজনবিদিত। বলা হচ্ছে মানব সভ্যতার বিকাশে বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার জীবনকে সহজ, গতিশীল করে তুলেছে। আবার একইসঙ্গে একথাটাও সেই বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শোনা যাচ্ছিলো যে, ‘বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। মূলত মানব চরিত্রের যে কোনো অনুভূতি প্রকাশ এবং নিয়ন্ত্রণে মানুষকে এক বিশেষ ধরনের ক্ষমতা দিয়েছেন স্রষ্টা। বিবেক নামক সেই বিশেষ শক্তির জোরে মানুষ ভালোমন্দের প্রভেদ করতে শেখে। ভালোকে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু মানব চরিত্রের প্রকৃত অবস্থান স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্নতর হয়ে থাকে। আর তাই ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা এই পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আজ পুরো পৃথিবীজুড়েই মানুষ সৃষ্টি করেছে হিংসা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব, কলহ, হানাহানি ও পরস্পর স্নেহ, মায়া-মমতা বর্জিত এক কলুষময় পরিবেশ। পারিবারিক পরিমণ্ডলে আজ দূরত্ব বাড়ছে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, প্রতিবেশী ও পরিজনহীন মানসিক অবস্থার শিকার সমাজের প্রায় সবশ্রেণির শহুরে মানুষ। পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চিত কৈশোর উত্তীর্ণ ছেলেটি অসত্ সঙ্গ বেছে নিচ্ছে, হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত। হতাশা ও দুর্ভাবনা যুক্ত হয়েছে তার সঙ্গে যেহেতু পারিবারিক কলহ, বাবা কিংবা মায়ের বিশ্বাসহীনতা, নির্যাতন, পারস্পরিক দূরত্ব সে লক্ষ করছে খুব কাছাকাছি অবস্থান থেকে। একশ্রেণির মূল্যবোধহীন মানুষ বিষয়টিকে কাজে লাগাচ্ছে। কিশোর অপরাধ, সাইবার অপরাধ, পর্ণোগ্রাফি, বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক ওষুধ সরবরাহ ইত্যাদির মাধ্যমে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রজন্মকে। অনেকটা কৌতূহলে, অনেকটা না বোঝার খেসারত দিচ্ছে তরুণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোমলমতি শিশু, কিশোররা। আবার পরিবার, সমাজ ও দেশের সর্বত্র একটা চরম অস্থির, অরাজকতা আজ লক্ষ করা যাচ্ছে। যেহেতু পরিবারই একটা শিশুর প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র, সেহেতু পরিবারেই বয়স্কদের সম্মান দেখানো, শিক্ষকের প্রতি নম্র-বিনয়ী হওয়া, সহপাঠী বন্ধুদের প্রতি কর্তব্য, নিকটাত্মীয়দের খোঁজ নেয়া, পরোপকারে এগিয়ে আসা, যে কোনো অন্যায়, অসত্যের পথে পা না বাড়ানো, মিথ্যার আশ্রয় না নেয়া, স্পষ্টভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ইত্যাদি শিক্ষা নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। কারণ এসব শিক্ষার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে বলেই ইভটিজিং, শিক্ষক লাঞ্ছনা, সহপাঠী হত্যা ইত্যাদি নানা অপরাধে তরুণ সমাজের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা, লোভ, পরশ্রীকাতরতা ধ্বংস করে দিচ্ছে তরুণ সমাজের মূল্যবোধ। সামান্য অর্থের লোভেও এখন খুনের মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে, নারীকে একটা সাধারণ ভোগ্যপণ্য ছাড়া আর কিছুই ভাবছে না একদল বিকৃত রুচির মানুষ। ঘটছে এমনকি শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা। ধর্ম, নৈতিকতা, মানবিকতার চর্চা বলতে গেলে উঠেই গেছে। প্রশ্ন হলো, মহাকালের স্রোতে মানবিক মূল্যবোধহীন মানুষ কি তলিয়ে যাবে? মানুষের পরিচয়, তার কর্মপরিধি ও সৃষ্টিশীলতা কি হারিয়ে যাবে কালের গর্ভে? যদি মানুষ তা না চায় তবে এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। কথা এবং কাজের মিল, নিজের পরিবারের ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি মানুষ হিসেবে তার সৃষ্টির মাহাত্ম্যও যথার্থতা প্রমাণের সুযোগ নিতে হবে। যে পিতা আজ দুর্নীতি ও অসত্ উপার্জনের জালে বন্দি, মিথ্যা ও প্রতারণা যার নিত্যসঙ্গী তাকে উপলব্ধি করতে হবে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য তিনি কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চান। যে মা আজ পরশ্রীকাতর, পরধন লোভে মত্ত, বিলাসী ও সম্পদের প্রদর্শনীতে ব্যস্ত তার অন্তরের উপলব্ধি হওয়া উচিত পরবর্তী প্রজন্মও হবে তার অন্ধ অনুসারী, সে কঠিন পাপের বেড়াজাল ছিন্ন করা আস্তে আস্তে আরো অসম্ভব হয়ে উঠবে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই টিকিয়ে রাখে সম্পর্ক। প্রজন্ম যেন সম্পর্কের সেই সূত্রটাই ধরতে পারে—নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করাই সকলের পবিত্র দায়িত্ব। ঢাকা