বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ভয়াবহ জালিয়াতি হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি ছাড়া ঋণ দেয়া, অনাদায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ফোর্সড লোন পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি, জামানত ছাড়া ঋণ দেয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন, ভুয়া চুক্তিপত্র তৈরিসহ নানা কৌশলে কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী ৯৬৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেছে ব্যাংকেরই কিছু কর্মকর্তা। ব্যাংকের স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়সহ সাত শাখায় এসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। কৃষি ব্যাংকের উপর পরিদর্শন চালিয়ে এসব অনিয়ম পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ।
ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পারিক যোগসাজশে জামানত ছাড়া ঋণ দেয়া হয়েছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর জামানত ছাড়া দেয়া ঋণগুলোর উপর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে এসব ঋণ আদায় অনিশ্চিত। এজন্য ওইসব ঋণ বিতরণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতি বছরই অন্যান্য ব্যাংকের মত কৃষি ব্যাংকের উপরও বিশদ পরিদর্শন পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরে ব্যাংকের ৩৬টি শাখার (মোট শাখা ৯৮৫) উপর পরিদর্শন পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির বিতরণ করা ১৩ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ঋণ চার হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৪ দমমিক ৭৯ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩শ ৯৪ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকের স্থানীয় মুখ্য কার্যালয় থেকে পদ্মা ফেব্রিক্স লিমিটেডের মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়া বিল অফ এক্সচেঞ্জ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্রের পরিমাণ ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই সীমাতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হয়েছে। যা গুরুতর অনিয়ম। এছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি ছাড়াই পদ্মা ব্লি¬চিং এন্ড ডাইং লিমিটেডের ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকার অনাদায়ী পাওনা ফোর্সড ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে। যদিও এ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিকট পাওনা ১৪০ কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
একই শাখার এসবি এক্সিম বাংলাদেশের মেয়াদোত্তীর্ণ বকেয়া ১৫১ কোটি টাকা যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৩ কোটি টাকা বেশি। গ্রাহকের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ থাকার পরও ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শাহজাহান বাবলু পাট ব্যবসার নামে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে স্থানান্তর করেন। শাখার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০ কোটি টাকা নিম্নমানে খেলাপি করেছে। এছাড়া মিমটেক্স নিটিংকে অনুমতি ছাড়াই অতিরিক্ত ঋণপত্র খোলার সুবিধা দেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক থেকে ১৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ নিলেও তার বিপরীতে জামানত রাখা হয় মাত্র দুই কোটি টাকা।
ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখা থেকে ফেয়ার ইয়ার্ন ৪২০ কোটি টাকা, আহমেদ মোবাইল গার্ডেন সাত কোটি টাকা, কেয়া ইয়ার্ন মিলস ৬৮ কোটি টাকা ও রোজবার্গ ইন্ডাস্ট্রিজ ১৮ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে বের করে নিয়েছে। যেগুলোর বেশিরভাগই খেলাপি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুধুমাত্র ইয়ার্ন প্রসেসিংয়ের জন্য ফেয়ার ইয়ার্ন ডাইংয়ের বিপরীতে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে তাকে উদ্দেশ্যমূলক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বনানী শাখা থেকে মেসার্স ফিয়াজ গ্রুপকে এলসি ও এলটি বাবদ ১৫ কোটি টাকা অর্থ সুবিধা দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে জেবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মা এয়ার জেট স্পিনিং, ওশিন স্পিনিং মিলস, মারহাবা স্পিনিং, স্টার কুটির শিল্প জেকি নিট, এঞ্জেল ওয়্যার হাউস, এইচ এইচ টেক্সটাইল, এ্যাবা টেক্সটাইল ও নিট পারজোয়ার টেক্সটাইল আইবিপি মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কয়েকটি বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, খুলনা করপোরেট শাখা থেকে মেসার্স এ্যাকোয়া রিসোর্সেস ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছে। একই শাখা থেকে মা বাণিজ্য ভান্ডারকে বিধি ভেঙ্গে ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, ৩০ আগস্ট যার অসমন্বিত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৮ কোটি টাকা। এছাড়া মেসার্স সুন্দরবন বারবার অনিয়ম ও শর্ত ভঙ্গ করার পরও এক কোটি ৩১ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি চালু না থাকা সত্ত্বেও রুগ্ন শিল্পের তালিকাভুক্ত করা হয়। কুষ্টিয়া শাখায় ৮টি হিসাবের বিপরীতে ২১ কোটি টাকা ক্ষতিজনক মানে ও ৫টি হিসাবের বিপরীতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকরণ করা হয়েছে। আগ্রাবাদ করপোরেট শাখায় প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে সাড়ে ২৫ কোটি টাকা।
এসব অনিয়ম ছাড়াও ব্যাংকের অধিকাংশ শাখায় ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অদাবিকৃত যেসব আমানত রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়ার কথা থাকলেও তা জমা দেয়নি কৃষি ব্যাংক। তাছাড়া ব্যাংকের হিসাব (অ্যাকাউন্ট) খোলার ক্ষেত্রে যেসব কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং যেসব ফরম পূরণ করতে হয় তা যথাযথভাবে করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
