যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বর্তমানে রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এটা দেশকে বিভক্ত করছে। বিক্ষোভকারীরা প্রথমদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে আন্দোলন চালালেও তারা এখন ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। এ কারণে তাদের প্রতি জন-সাধারণের সমর্থন কমে গেছে। বিরোধীদল বিএনপি ও তার শরিকরা একে ইসলাম বিরোধী ও ইসলামপন্থিদের লড়াই হিসেবে দেখছে। লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ইকোনমিস্টের শনিবারের জন্য ছাপা সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি গতকাল তাদের অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। ‘বাংলাদেশে অস্থিরতা’ ‘একটি জাতি বিভক্ত’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৪২ বছর চেপে থাকা ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতাকে খেপিয়ে তুলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে সহিংসতায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ ঘটনাকে সহিংসতা দমনের অজুহাতে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ‘খুনের উল্লাস’ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর এখন পর্যন্ত ৬৭ জন নিহত হয়েছে। এ রায় প্রত্যাশিত থাকলেও জামায়াত ও শিবির কর্মীরা ক্ষিপ্তভাবে এর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বগুড়ায় সেনা মোতায়েনও করা হয়। জামায়াত এখন বিদ্রোহী রাজনৈতিক দলের মতো আচরণ করছে। তারা শিশু ও মানুষকে বিক্ষোভের ক্ষেত্রে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। হিন্দু মন্দির, বাড়ি ও পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চের আগে আরো একজনের মামলার রায় হতে পারে। আর এ বছরের মধ্যে জামায়াত নেতাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতের টিকে থাকার এ সহিংস লড়াই বিরোধী দল বিএনপির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে এ বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারে আর সেক্যুলারিজম হুমকির মুখে পড়তে পারে। যদিও ভারত চাইবে না এটা হোক। সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকালে হরতালে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেননি।
ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকরা সৌজন্যতার সাথে ট্রাইব্যুনালের যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ও রাজপথে সংযম প্রদর্শনের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে তারা বলছে, যে এ বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেই। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কারণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তারা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে ছিলো। সৌদি আরব নীরব ভূমিকা দেখাচ্ছে, কিন্তু ভারত বাংলাদেশের চলমান প্রক্রিয়ায় সমর্থন দিচ্ছে। আর চীন এ বিষয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছে না। ২০০৭ সালে জানুয়ারিতে বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত অনির্বাচিত সরকারকে বিশ্বের অনেক দেশই পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছিলো। বিদেশিরা ট্রাইব্যুনালের কলঙ্ক নিয়ে ক্ষুব্ধ। কিন্তু এ অবস্থায় বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে অবমাননাকর।
