শিল্পখাতে গ্যাস সংযোগ নিয়ে অরাজকতা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২২:৩০
শিল্পখাতে গ্যাস সংযোগ নিয়ে অরাজকতা চলছে। উদ্যোক্তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ডিমান্ড নোট ইস্যু করেছে, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট অর্থ জমা দেয়া হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে পাইপলাইনও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু ওই কারখানাগুলোয় আর গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। ডিমান্ড নোট ইস্যুর পর অনেক উদ্যোক্তা আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলে কারখানার মেশিনপত্রও নিয়ে এসেছেন। দুই-তিন বছরের বেশি সময় ধরে এসব মেশিন বাক্সেই পড়ে রয়েছে। উত্পাদনে যেতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কারখানা। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি উত্পাদনে যাবার আগেই ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারার কারণে রুগ্ন হয়ে পড়েছে। ডিমান্ড নোট ইস্যুর পর টাকা জমা দিয়ে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন-এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কত তা জানা যায়নি। তবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর কাছে সমপ্রতি এ রকম ৮৩ জন উদ্যোক্তা গ্যাস না পাবার অভিযোগ করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিনিয়োগকৃত অর্থের অধিকাংশই ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। আর ৮৩টি কারখানার মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি বস্ত্রখাতের কারখানা। এগুলোর সবই রপ্তানিমুখী শিল্প। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাবার পর এফবিসিসিআই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগ না দেয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো উত্পাদনে যেতে পারছে না। এতে উদ্যোক্তারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিয়েছে, তাদের অর্থায়নও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে এফবিসিসিআই উদ্যোক্তাদের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গ্যাস সংযোগ না দেয়া পর্যন্ত ঋণের সুদ মওকুফের অনুরোধ জানিয়েছে। প্রসঙ্গত, গ্যাস স্বল্পতার কথা বলে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ২০০৯ সাল থেকে শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখে। যে সব উদ্যোক্তারা আগেই ডিমান্ড নোটের বিপরীতে তিতাসকে অর্থ জমা দিয়েছেন তারাও গ্যাস পাননি। এফবিসিসিআই যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে সে সব মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাদের মতামত জানায়নি বলে জানা গেছে। তবে, একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর পর সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে তা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, তিতাস গ্যাস দিতে পারছে না, তার দায়ভার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন নেবে? তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত নিয়ে তা বিনিয়োগ করে থাকে। সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে ব্যাংকের কোন বিনিয়োগ যদি খেলাপী হয়ে যায় তাহলে তা হবে দুঃখজনক। তিনিও ব্যাংকের বিনিয়োগ নিরাপদ করতে কারখানাগুলোতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেয়ার দাবি জানান। জানা গেছে, ব্যাংক একজন বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ প্রস্তাব বিবেচনা করার সময় অনেকগুলো বিষয় আমলে নেয়। এর মধ্যে গ্যাস এবং বিদ্যুত্ সংযোগ অন্যতম। যেসব উদ্যোক্তারা গ্যাস সংযোগ পাননি তাদের সবাই ব্যাংকের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে গ্যাস সংযোগের কথা উল্লেখ ছিলো। এদিকে, গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার সিদ্ধান্ত থাকলেও কোন কোন কারখানায় কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থায় সংযোগ দিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিতাসের একশ্রেণির কর্মকর্তার সহায়তায় এসব অবৈধ সংযোগ দেয়ার কাজ চলছে। ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে গ্যাস সংযোগ পাননি এমন একজন উদ্যোক্তা ইত্তেফাককে বলেন, তিতাসের ইস্যু করা ডিমান্ড নোটের প্রেক্ষিতে টাকা জমা দেয়া হয়েছে। পাইপলাইনও স্থাপন করেছি নিজ খরচে। এরপর এলসি করে মেশিনপত্র নিয়ে আসা হয়েছে। গ্যাস না পাওয়ায় সে মেশিন বাক্সে পড়ে আছে। প্রতিনিয়ত ব্যাংকের সুদ বাড়ছে। তিনি বলেন, আমার আরো কয়েকটি চালু কারখানা আছে। কিন্তু এটির ঘানি টানতে টানতে ওই কারখানাগুলোও রুগ্ন হয়ে যাচ্ছে।