মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি

বাইডেনের ভূমিকা থাকবে

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৩
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবারও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বর্ধিত দায়িত্বে থাকছেন। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদকালেও তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদেও সেই একই দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। তিনি তার ব্যক্তিগত মেধা ও দক্ষতার কারণেই এই দায়িত্বে বহাল থাকছেন। প্রথমবারের সফলতাই তাকে নতুন করে এই আসনে বসাচ্ছে। বলা যেতে পারে এরই মধ্যে তার সেই ভূমিকা শুরু হয়েছে কিংবা সামনের দিনগুলোতে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ওপর পররাষ্ট্র সম্পর্কিত সব বিষয়ের দায়িত্ব সরাসরি বর্তালেও বাড়তি ভূমিকা তথা বহির্বিশ্বে বৈদেশিক সম্পর্ক আরো উন্নয়নে ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিশেষ ব্যক্তি হিসাবে এ কাজ করতে হচ্ছে। ওবামা প্রশাসনে এরই মধ্যে তিনি তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সকলের কাছে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাড়তি ভূমিকা পালন করছেন বলে ওবামা প্রশাসনের অনেক সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা মনে করেছেন। তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদেও মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে তার প্রভাব থাকবে। আর এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তার উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব আসছে। এ মাসের শেষের দিকে কিংবা তার পরের মাসে ওবামা ইসরাইল সফরে যেতে পারেন। ওবামা সে সময়ে বার্ষিক আমেরিকা-ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’তে (ইসরাইলপন্থী একটা প্রভাবশালী লবিং গ্রুপ) বক্তব্য রাখবেন। ২০০৯ সালে এই কমিটিতে বক্তব্য রেখেছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন। তিনি তখন ইসরাইলকে সতর্ক করে বলেছিলেন, আপনারা প্রেসিডেন্ট ওবামাকে অগ্রাহ্য করে কোন কিছু করতে পারেন না। আপনাদের অবশ্যই পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। অনেকটা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি কথাগুলো বলেছিলেন। তবে এবারে কর্মকর্তারা জানান, তিনি ওবামার সফরকালে অনেকটা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত মাইকেল বি. অরেন বলেন, ইসরাইলপন্থী কমিউনিটির কাছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বেশ বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। কেন না তিনি সব সময়ই আমাদের সঙ্গে সরাসরি ও আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলেন। এ কারণে আমাদের মাঝে তার সম্পর্কে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। এ থেকে এটাও স্পষ্ট যে বাইডেনের অবস্থান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতামতেরই প্রতিফলন ঘটাবে। কর্মকর্তারা বলেন, ক্যাপিটল হিলের সঙ্গে বাইডেনের সম্পর্ক বজায় রাখাটাও হচ্ছে তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে একটি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হেগেল তার পুরনো বন্ধু। হেগেলের সঙ্গেও তার ভালো যোগাযোগ রয়েছে। তবে ইরানের বিষয় নিয়ে তার অবস্থান অনেকটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আফগানিস্তান থেকে দ্রুততম সময়ে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করার বিষয় নিয়েও বাইডেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই ২০১৪ সালের মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য চলে আসছে। সিরিয়া বিষয়ে তিনি তার ভূমিকা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। এ সংকট নিরসনে তিনি তার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহে বিরোধিতা করেন। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করেন সিআইএ’র সাবেক পরিচালক ডেভিড এইচ.পেট্রাউস। এটি তখন সমর্থন করেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। তবে বাইডেন এ প্রস্তাবনা সমর্থন করেননি। আবার কেরি ও চাক হেগেল বাইডেনের কেবল পুুরনো বন্ধুই নয়, বর্তমানে তারা একসঙ্গে কাজ করছেন। বাইডেনের শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতি সহায়ক অ্যান্টনি জে. ব্লিনকেনকে পদোন্নতি দিয়ে বারাক ওবামার ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার করা হয়েছে। এ পদে আগে ছিলেন ডেনিস আর ম্যাকডোনাগ। ব্লিনকেনের এ পদে আসার ফলে ধারণা করা হচ্ছে, পররাষ্ট্র দফতর, পেন্টাগন ও সিআইএ’র মধ্যে দূরত্ব অনেকটা কমে আসবে কিংবা তাদের মধ্যে যে অলিখিত বিরোধ রয়েছে তার নিষ্পত্তি ঘটবে। শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতির পরামর্শক হিসাবে বাইডেনের কাছ থেকে ব্লিনকেন পদোন্নতি পেয়ে চলে যাওয়ার কারণে এ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন জ্যাকব জে সুলিভান। তাকে বলা হয় এক উদীয়মান নক্ষত্র, যিনি হিলারি ক্লিনটনের শীর্ষ উপদেষ্টা ছিলেন। সুলিভানের অভিজ্ঞতা রয়েছে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সফরসঙ্গী হয়ে কাজ করার। সে সময়ে সুলিভান পররাষ্ট্র দফতরের পরিকল্পনা নীতির পরিচালক ছিলেন। আরব গণজাগরণ ও চীনের সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বারাক ওবামা ইরাক বিষয়ে দায়-দায়িত্ব দিয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। বাইডেন ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে এখানে একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, বাইডেন সত্যিকার অর্থে সৈন্য প্রত্যাহার করে বিধ্বস্ত ইরাকের কতখানি উপকার করতে পেরেছেন। কেননা যুদ্ধবিধ্বস্ত এ দেশটি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। বরং প্রায়ই সেখানে বোমা হামলায় মারা যাচ্ছে বহু মানুষ । চীনের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রয়েছে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। জিনপিং ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ২০১১ সালে চীন সফরে যান বাইডেন। সে সময়ে তিনি তার সঙ্গে ভালো সময় কাটান। আবার গত বছর তার আমন্ত্রণে শি জিনপিং ওয়াশিংটনে গেলে সেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং উভয়ের মাঝে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে হূদ্যতাপূর্ণ আলোচনা হয়। বেইজিংয়ে ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের বৈঠকে জি জিনপিং যখন প্রেসিডেন্ট হন সে সময়ে তার সমকক্ষ ছিলেন ওবামা। কিন্তু জিনপিংয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে তার সঙ্গে বাইডেনের সাক্ষাত্ হয় এবং উভয়ের মাঝে আন্তরিকতাপূর্ণ কথাবার্তা হয়। এতে করে এখানে বাইডেনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকটাই ফুটে উঠেছে। উভয় দেশের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠার জন্য একটি ক্ষেত্র তৈরি হয় যা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। এ সকল কারণেই ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বাড়তি দায়িত্বে থাকছেন বাইডেন। এছাড়া সিরিয়া বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পদক্ষেপ সংকট সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে অনেকে মনে করছেন। বিশেষ করে গত সপ্তাহে রোমে সিরিয়ার বিরোধী জোটের নেতা মুয়াজ আল খতিবের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির প্রথমদিকে যে আলোচনায় বসার কথা ছিল তা বয়কটের ঘোষণা দেয় ওই জোট। পরে বাইডেন তার বাড়তি দায়িত্ব থেকে বলেন, এ ব্যাপারে তিনি প্রয়োজনে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আলোচনায় বসবেন। পরে অবশ্য জন কেরির সঙ্গে মুয়াজ আল খতিবের বৈঠক হয়। বৈঠকে কেরি বলেন, প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী যোদ্ধাদের আরো সাহায্য প্রয়োজন। কেননা ওয়াশিংটন চায় দেশটির ক্ষমতার দ্রুত পালাবদল। বাইডেনের সিরিয়া বিষয়ে যে যথেষ্ট ভাবনা-চিন্তা রয়েছে তার উত্কৃষ্ট প্রমাণ সামপ্রতিক মিউনিখের নিরাপত্তা বৈঠক। এখানে বৈঠককালে মুয়াজ আল খতিবকে বাইডেন বলেছিলেন, আমরা আপনাদের পাশে সব সময়ই থাকবো। এজন্য প্রয়োজনে আমাদের যা যা করা দরকার তা-ই আমরা করবো। এ সময় বাইডেন খতিবকে তার সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এ সভা যে আমাদের জন্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য বাইডেনের সহায়তাকারীরা এ বিষয়ে সরাসরি কোন মন্তব্য করেননি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার বেনজামিন জে রোডস বলেন, বাইডেন পররাষ্ট্রনীতির এ বিষয়গুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা থাকবে জো বাইডেনের যা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভালো ফলাফল আনতে পারে।