ভেনিজুয়েলার নক্ষত্রের বিদায়

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৩
প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুতে শোকে পাথর ভেনিজুয়েলাবাসী। চিরকালই লড়াকু এই বিপ্লবী নেতা দুই বছর লড়ছিলেন ক্যান্সারের সঙ্গে। জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য সমপ্রতি শ্যাভেজকে কিউবায় যেতে হয়েছিল বার বার। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে গত বুধবার মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার। শ্যাভেজের জনপ্রিয়তা এবং জনমনোহরণী শক্তি— দুটোই ছিল অবিশ্বাস্য। শ্রমিক পরিবারের এই সন্তানই হয়ে উঠেছিলেন সমাজতন্ত্রের নতুন প্রতীক। ক্যান্সারের কাছে হার মানতে না হলে তিনিই হতে পারতেন ফিদেল ক্যাস্ট্রোর পর লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। ইতিহাস শ্যাভেজকে চে গুয়েভারা বা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সমগোত্রীয় নেতার মর্যাদা দেবে কি দেবে না, সেটা অন্য বিতর্ক। কিন্তু যে ধারার সমাজতন্ত্রকে শ্যাভেজ সাময়িকভাবে নিজের দেশে জনপ্রিয় করে তুলতে পেরেছিলেন, তার অনুপস্থিতিতে সেটা কতদূর কার্যকর থাকবে বা থাকা সম্ভব তা নিয়েও বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। অনেকেই মনে করেন শ্যাভেজের ক্ষেত্রে শেষ সত্যটা হল ‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহান।’ শ্যাভেজ প্রাথমিকভাবে ভেনিজুয়েলায় এবং সাধারণভাবে গোটা লাতিন আমেরিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন লাতিন আমেরিকার অতি বর্ণময় ব্যক্তিত্ব। সাম্রাজ্যবিরোধী দৃঢ় মনোভাব, লাতিন আমেরিকার ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক উদ্যোগ শ্যাভেজকে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে প্রভাবশালী লাতিন সাম্যবাদীর পরিচয় এনে দিয়েছিল। অল্প বয়সে তার মৃত্যুর পর এই শূন্যস্থান কে কীভাবে পূরণ করবেন বা আদৌ পূরণ হবে কিনা বলা যাচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার শ্যাভেজের শেষযাত্রার আট কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে সাত ঘণ্টারও বেশি। প্রয়াত প্রেসিডেন্টকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নজিরবিহীন ঢল নামে জনতার। ‘ক্যারিশমাটিক’ এই প্রেসিডেন্টের বর্ণময় কর্মজীবন শুরু হয়েছিল রাজধানী কারাকাসের মিলিটারি একাডেমি থেকে। সেনা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দেহ নিয়ে আসা হয় ফের এখানেই। রাজধানী কারাকাসের এই সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই একে একে বন্ধুকে শেষ সম্মান জানিয়ে যান লাতিন আমেরিকারই তিন দেশের তিন প্রেসিডেন্ট। শুধু একাডেমিতেই নয়, রাজধানী কারাকাসের পথে সাত ঘণ্টার দীর্ঘ সফরেও ভেনিজুয়েলার সেনাকর্তা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে সমানে পা মিলিয়েছিলেন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টও। একবার তো ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল তাদের। সেনা হাসপাতাল থেকে শ্যাভেজের দেহ নিয়ে যখন শোকমিছিল বের হয় তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন শ্যাভেজের মা এলিনা ফ্রিয়াজ শ্যাভেজও। কিন্তু পথে নামার পর প্রেসিডেন্ট চলে যান সেই জনতার হাতে, এতদিন যারা ছিলেন তার প্রধান শক্তি। শবাধারকে একবার ছোঁয়ার জন্য, মৃত প্রেসিডেন্টের কাছে একবার যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায় মানুষের মধ্যে। প্রায় সবার গায়েই তখন হুগো শ্যাভেজের পছন্দের লাল রংয়ের কোট অথবা দেশের জাতীয় পতাকার মতো হলুদ-নীল মেশানো জামা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে হুগো শ্যাভেজের শেষ মুহূর্তগুলো সম্পর্কে এখনও কিছু বলা হয়নি। তবে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের প্রধান জেনারেল হোসে ওরনেয়া জানিয়েছেন, দুই বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকলেও তার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ নাকি হার্ট অ্যাটাক। মৃত্যুর একদিন আগে শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল প্রেসিডেন্টের। ক্রমশ তার প্রকোপ মাত্রাছাড়া হয়ে পড়ে। শ্যাভেজকে যখন কৃত্রিম ভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চালানোর চেষ্টা চলছিল তখনই তার হার্ট অ্যাটাক হয়। সেই ধাক্কা শেষ পর্যন্ত আর সামলাতে পারেননি মুমূর্ষু প্রেসিডেন্ট। এই বিপ্লবী নেতার মৃতদেহ মমি করে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেনিজুয়েলা সরকার। প্রয়াত এই নেতার স্বঘোষিত সমাজবাদী বিপ্লব জিইয়ে রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো বলেন, শ্যাভেজের মরদেহ মমি করে সামরিক জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য রাখা হবে। তিনি জানান, এই কমরেডের প্রতি সর্বস্তরের মানুষ যাতে নিরন্তর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারে, এ জন্য মরদেহটি মমি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মুদ্রার অপর পিঠে: শ্যাভেজের মৃত্যুসংবাদে ভেনিজুয়েলার বেশিরভাগ মানুষের বুকফাটা কান্নায় ভাসলেও স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলেছেন কিছু মানুষ। ভেনিজুয়েলার বিত্তবান সমপ্রদায়ের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না তিনি। একই সঙ্গে খুশির হাওয়া ছিল বিরোধী মহলেও। শ্যাভেজের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্র চালানোর অভিযোগ এনেছিলেন তারা। বিরোধী নেতা অঁরিক ক্যাপ্রিলস অবশ্য শ্যাভেজ-সমর্থকদের প্রতি ঐক্য ও সমবেদনা জানিয়েছেন। শ্যাভেজের অনুপস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচনে অঁরিক ক্যাপ্রিলস-এর বিরুদ্ধেই শক্তির পরীক্ষায় নামবেন নিকোলাস মাদুরো। গত শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেয়ার পর মাদুরো জানিয়েছেন, ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। প্রেসিডেন্ট শ্যাভেজ নিজেই এক সময় ঘোষণা করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা ছাড়লে এক মাসের মধ্যেই নির্বাচন ডাকা বাধ্যতামূলক। নির্বাচন কমিশন গতকাল জানিয়েছে, ১৪ এপ্রিল নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জেতার আশায় রয়েছেন বিরোধীরাও। একই সঙ্গে ভেনিজুয়েলার দিকে নজর রয়েছে কিউবা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও। লাতিন আমেরিকার খনিজ তেলের ভাণ্ডার দখল করা নিয়ে সংঘাত চরমে ওঠার আশঙ্কা করছেন দেশের মানুষ। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যাপ্রিলস-এর থেকে মাদুরোর জনপ্রিয়তা কিছুটা বেশি। কারণও আছে। মাদুরোকে নিজের উত্তরসূরি চিহ্নিত করে গিয়েছিলেন স্বয়ং শ্যাভেজ। আর শ্যাভেজের মৃত্যুতে উথলে ওঠা জনসমর্থনের অনেকটাই মাদুরোর পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষমতায় এলে পূর্বসূরির সমাজতন্ত্রের পথেই চলবেন শ্যাভেজের একদা ছায়াসঙ্গী মাদুরো, এমনটিই অনুমান রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।