দৃষ্টিনন্দন অলঙ্করণ। চকচকে কাচ আর উজ্জ্বল স্টিলের অপূর্ব সম্মিলন। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। শুধু কি অফিস; কর্মীরাও কেতাদুরস্থ। গায়ে ঝুলছে পাওয়ার স্যুট, নয় তো পেনসিল স্কার্ট। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে নিউইয়র্ক কিংবা লন্ডনের কোনো অফিস এটি। কিন্তু না, এই অফিসটির অবস্থান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন সবচেয়ে রক্ষণশীল দেশটিতে আবার স্কার্ট এলো কোত্থেকে; সেখানে তো জনসমক্ষে নারীদের মেনে চলতে হয় কঠোর পোশাকবিধি। আবায়া (Abaya) খ্যাত কালো বোরকা, হেডস্কার্ফ, নেকাব ও মোজায় ঢাকা থাকে গোটা শরীর।
ওপরে বর্ণিত অফিসটি মিডিয়া কোম্পানি রোটানার। ওখানে নারী-পুরুষ কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত অফিসটিতে পুরুষরা সংখ্যালঘু। এর কারণ দুটি। চাইলেই কোনো পুরুষ প্রার্থীকে চাকরি দেয়া হয় না। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক সুলতানা আল-রোয়াইলি এ কাজটি করেন সুকৌশলে। তিনি এজন্য সাজানো নাটকের আশ্রয় নেন। সাক্ষাত্কার চলাকালে একজন সহকারিণী অহেতুক ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। সাক্ষাত্কারের বিষয়টি মাথায় না রেখে বারবার তাকালে কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে না পারলে তাকে চাকরি দেয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, চাকরি চাইতে এসে অনেক পুরুষ নাকচ করে দেন চাকরিদাতাকেই। মহিলার সামনে সাক্ষাত্কার দিতে রাজি হন না। ভাবেন, এটি পুরুষত্বের অপমান।
সৌদি আরবে নারীরা এখন পর্যন্ত গাড়ি চালাতে পারে না। বাড়ি থেকে দোকানে যেতে হলে পর্যন্ত অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়। সে জায়গায় বেশ কিছু নারী এখন চাকরি করছে, তাও আবার অন্যদের সঙ্গে। তার মানে হচ্ছে, স্বামী, বাবা বা ভাইয়ের অনুমতি নিয়েই নারীরা কাজে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে সৌদি রাজ পরিবার উদার হতে শুরু করেছে, বিশেষত বাদশাহ আবদুল্লাহ। সেই রাজ পরিবারেরই সদস্য তালাল বিন আব্দুল আজিজ আল সউদ হচ্ছেন রোটানা মিডিয়া কোম্পানির কর্ণধার। বস্তুত, ধীরে হলেও নারীর ব্যাপারে মনোভাব পালটাতে শুরু করেছে সৌদি আরব। ব্যাংক এবং হাসপাতালে কর্মজীবী নারীর দেখা পাওয়া এখন আর বিরল কোনো ঘটনা নয়। রিয়াদের কিং ফয়সাল স্পেশালিস্ট হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক নোরা আল মালহুক এব্যাপারে বলেন, বেশিদিন আগের কথা নয়, মহিলা ডাক্তার অথবা নার্স দেখলে পুরুষরা জিজ্ঞেস করতো, সে কেনো কাজ করছে? তার অর্থের এতো কী দরকার?
নারীদের শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হচ্ছে সৌদি আরবে। দেশটিতে কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে একটি সহশিক্ষামূলক বিশ্ববিদ্যালয়। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণকে রাষ্ট্র উত্সাহিত করছে। শিশু ও নারীদের গৃহনির্যাতন থেকে রক্ষা করতে নেয়া হয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। এ সম্পর্কিত বিলবোর্ড প্রায়ই চোখে পড়ে। শুরা পরিষদের ১৫৬ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটিতে নারী রয়েছেন পাঁচজন। তাদেরই একজন ড. মাহা আলমুনিফের অভিমত, নারীর প্রতি সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটছে। নারীরা ঠিকই উঠে আসবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে। ভবিষ্যতে গ্রহণ করা হবে অনেক বড় উদ্যোগ। অধিকাংশ লোক প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত বলে হঠাত্ করে সামাজিক নিয়ম বদলে দেয়া সম্ভব নয়। নারীদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে ধীরে ধীরে।
পরিবর্তনের গতি ধীর হলেও নারীবাদী ও মানবাধিকার কর্মীরা এখন অনেকটাই স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। শুরা পরিষদে নারী অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে তারা বাহবা দিলেও প্রশ্ন তুলছেন নারী-পুরুষের অনুপাত নিয়ে। তাছাড়া এতে উল্লসিত হবার মতো কিছু ঘটেনি। শুরা পরিষদে নারীদের ভোটাধিকার নেই পুরুষদের মতো। এটি স্রেফ প্রতিকী এবং বিষয়টিকে নারীবাদী ও মানবাধিকার কর্মীরা অবমাননাকর মনে করছেন। কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের উম্যানস হিস্টোরি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কলামিস্ট হাতুন আজওয়াদ আল-ফাদি বলেন, আমরা নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ কামনা করি। নারীর জন্য বন্ধ থাকা সব জানালাই খুলে দেয়া উচিত। সৌদি আরবের লোকজন চাইলেই সমবেত হতে পারে না। এ ব্যাপারে রয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণ। এমনকি নিজ ঘরেও রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা নিষেধ। কাজেই আমরা বুঝতে পারি না যে, কতোজন নারী পরিবর্তন চাচ্ছে। এ অবস্থায় নারী আন্দোলনের ডাক দিলে তা হবে বাড়াবাড়ি। তবে আমরা গর্বিত, কিছু একটা ঘটছে সৌদি আরবে। পুরোপুরি স্বাধীন না হলেও নারীদের মত প্রকাশ এখন সম্ভব, যা আগে কখনোই সম্ভব ছিলো না।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১) যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের টুইন টাওয়ারে আক্রমণের পর থেকেই সৌদি আরবের পশ্চিমা মিত্ররা বেশ চাপ সৃষ্টি করছে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের জন্য। এর পেছনে যুক্তিও আছে তাদের। ওসামা বিন লাদেন ছাড়াও নাইন ইলেভেনে জড়িত ১৯ জন হাইজ্যাকারের মধ্যে ১৫ জনেরই মাতৃভূমি সৌদি আরব। তারা মনে করেন- উচ্চ বেকারত্ব, সীমিত গণতান্ত্রিক অধিকার ও নারীর প্রতি সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তরুণরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এসব ব্যাপারে বাদশাহ আব্দুল্লাহকেও নমনীয় মনে হচ্ছে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সরকারি কিছু উচ্চপদে রদবদল করেন। এর মধ্যে সরিয়ে নেয়া হয় এক বিচারককে। যিনি এক বিচারের রায় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, যেসব টেলিভিশন চ্যানেলে অনৈতিকতা প্রচার করা হয়, সেসব চ্যানেলের মালিকদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আব্দুল্লাহ শিক্ষামন্ত্রীকে ডেকে বলেছেন, ইসলামের সহিষ্ণুতার ঐতিহ্য ও নারীর প্রতি সহনীয় আচরণ শিক্ষা দেয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে। নারী শিক্ষাকে উত্সাহিত করতে উপ-শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে নুরাহ আল ফাইজকে। সৌদি আরবের ইতিহাসে ক্যাবিনেটে ঠাঁই পাওয়া প্রথম নারী তিনি।
সৌদি রাজকুমারী আবদেলাহ’র পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৯৯ সালে গৃহীত হয়েছিলো জাতীয় পারিবারিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। তারই ধারাবাহিকতায় স্ত্রী ও সন্তানদের মারধরকে অনৈতিক ও অবৈধ ঘোষণা করে ২০০৬ সালে করা হয় নতুন আইন। নির্যতিত নারী এখন আইনের দ্বারস্থ হতে পারেন। তবে এ কাজ সহজে হয়নি। অধিকাংশ পুরুষেরই অভিমত, এমন আইন করা ঠিক হয়নি। আবদেলাহ’র উপস্থিতিতে এক সভায় একজন বিচারক বলেছিলেন, স্ত্রীকে প্রহার করার অধিকার স্বামীর থাকা উচিত। কেনাকাটায় অধিক অর্থ খরচ করলে তাকে প্রহার করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এ কথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন দর্শক সারিতে বসা নারীরা। পরের দিন বিভিন্ন পত্রিকায় এ নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা ছাপা হয়েছিলো।
তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পোন্নত হতে চাইছে সৌদি আরব। কিন্তু অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে (নারী) রাইরে রেখে তা কীভাবে সম্ভব? কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ভাবছে গভীরভাবে। রোটানা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী আল রোয়াইলি বলছিলেন, ‘পুতুল সেজে বসে থাকার দিন শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। আমরা সূচনা করেছি। অন্যরা এগিয়ে আসবে আমাদের দেখে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় সৌদি নারীরা ঠিকই মানিয়ে নেবে নিজেদের।’
