চা বাগান আর বনাঞ্চল পরিবেষ্টিত মৌলভীবাজার জেলায় আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। চলতি মৌসুমে দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার বিদেশি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন চা বাগানে চা গাছে রেড স্পাইডারের (লাল রোগ) আক্রমণে মরে যাচ্ছে গাছ।
সেচ ব্যবস্থা থাকলেও অনাবৃষ্টিতে নদী ও ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ দিতে না পারায় চায়ের উত্পাদন হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাতের কোন সম্ভাবনা না থাকায় চায়ের উত্পাদন হ্রাস পেয়ে চা শিল্পের উপর এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
কমলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি চা বাগান ঘুরে জানা যায়, অনাবৃষ্টিতে এ বছর কমলগঞ্জ উপজেলার ২২ টি চা বাগানে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। খরতাপে নতুন সৃজিত ও পুরানো চা গাছ মরে যাচ্ছে। নদী-ছড়াসহ চা বাগানের জলাশয়ে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বাগানে সেচ ব্যবস্থা থাকলেও টিলায় নিয়মিত সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে চা গাছ রেড স্পাইডার-এর আক্রমণেরও শিকার এবং বাগানের টিলায় চা গাছ মরে যাচ্ছে। চলতি মৌসুমে চা বাগানের প্ল¬ান্টেশন এলাকার চা গাছে আগাছা ছেঁটে দেয়া হয়। এসব কাজের পর নিয়মিত সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয়। মাঘ মাসে হাল্কা বৃষ্টি হলে চা বাগানে চারাগাছ দ্রুত গজাতে থাকে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের মালিকানাধীন একটি বাগানের ব্যবস্থাপক জানান, মাঘ মাসের বৃষ্টি চা বাগানের জন্য খুবই উপকারী।
বিটিবি সূত্রে জানা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়া, অব্যবস্থাপনার কারণে উত্পাদন হ্রাস পাচ্ছে। চার-পাঁচ মাস শ্রীমঙ্গল ও আশেপাশের এলাকায় চা বাগানের বিভিন্ন টিলায় পাহাড়ি ছড়া, লেক ও গভীর নলকূপ থেকে সেচ দেয়া হয়। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানির স্তর নিচে নামতে শুরু করে এবং বিভিন্ন নদী ও ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের অভাবে চা গাছে পানি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অধিকাংশ চায়ের টিলা ও সেকশন থেকে ছায়াবৃক্ষ চুরি হয়ে যাওয়ায় পানি শোষণ ক্ষমতা হারিয়ে চা গাছ মরে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চা শিল্পেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চা গাছে ছায়াদানকারী গাছরক্ষা ও পানি স্বল্পতা মোকাবেলায় চা বাগানের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত নদী-নালা, ছড়া ও খাল খনন করে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চা বাগান সংশ্লিষ্টদের নিকট দাবি জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ চা সংসদের কর্মকর্তারা বলেন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে একদিকে কাঠ পাচারকারীরা বাগানের ছায়াদানকারী মূল্যবান গাছ কেটে উজাড় করছে। অন্যদিকে বিগত কয়েক মাসে অনাবৃষ্টির কারণে চা গাছ মরে যাচ্ছে। এসব চা গাছ রক্ষায় পানির অভাবে সেচ দেয়া যাচ্ছে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে চা বাগানে ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের কিছু অংশ চা এলাকায় ব্যয় করা প্রয়োজন বলে তারা মন্তব্য করেন। চা শিল্পে কর্মরত অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এমনিতেই চায়ের আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে। তার উপর বৃষ্টিপাতের তারতম্য ঘটতে শুরু করেছে। আশঙ্কাজনকহারে উত্পাদন হ্রাস পাবে।
বৃষ্টি না হওয়ার কারণে চা গাছে ক্ষতির কথা স্বীকার করে কমলগঞ্জে এনটিসির চাম্পারায় চা বাগান ব্যবস্থাপক মোঃ রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, যথা সময়ে বৃষ্টিপাত হলে চা বাগানে এতোদিনে উত্পাদন সম্ভব হতো। সেচ ব্যবস্থা থাকায় কিছুটা সেচ দিয়ে চা গাছ রক্ষা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে শুকিয়ে চা গাছ মরে যাচ্ছে এবং রেড স্পাইডারের আক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এদিকে মার্চের শেষ সপ্তাহের আগে এতদাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই বলে জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তর শ্রীমঙ্গল অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক হারুনুর রশীদ।
