সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব বুলবুলের ভাই মিরাজকে শ্বাসরোধ করে হত্যা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ২২:২৩
যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদানকারী দেশবরেণ্য গীতিকার ও সুরকার মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছোট ভাই মিরাজ উদ্দিন আহমেদকে (৫৫) খুন করা হয়েছে। শনিবার রাতে রাজধানীর খিলক্ষেত ওভার ব্রিজের কাছে রেললাইনের পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশটি রেললাইনের পাশে পড়েছিল। খবর পেয়ে খিলক্ষেত থানা ও জিআরপি পুলিশ শনিবার রাত আনুমানিক ৪টার দিকে তার লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. সোহেল মাহমুদ গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, লাশের শরীরে বাইরে থেকে কোন আঘাতের চিহ্ন দেখা না গেলেও দুই ঠোঁটের ভেতর, মাথার পেছনে ও বুকের ভেতর রক্ত জমাট বাঁধা ছিল। নাক ছিল ভাঙ্গা। আঘাতের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। কখন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক জানান, মৃতদেহ দেখে মনে হচ্ছে রাত আনুমানিক দশটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। তার পাকস্থলিতে অর্ধপাচ্য খাবারের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। এতে মনে হচ্ছে তিনি ঘটনার দুই ঘণ্টা আগে খাবার খেয়েছিলেন। নিহতের পবিবারের ধারণা, বড় ভাই বুলবুল মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার প্রতিহিংসার জের ধরেই মিরাজকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গোলাম আযমের মামলার ১৪তম সাক্ষী ইমতিয়াজ আহমেদ বুলবুল। খিলক্ষেত থানার ওসি শামীম হোসেন জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় মামলা দায়ের করা হয়নি। তারপরও রহস্য উদঘাটনে থানা, ডিবি , সিআইডি ও র্যাব তদন্ত শুরু করেছে। ইমতিয়াজ আহমেদ বুলবুলের ভাগ্নে আনোয়ারুল আজম মোহন গতকাল মর্গে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মিরাজ ছিলেন সবার ছোট। অবিবাহিত মিজার থাকতেন মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে বোনের সঙ্গে । তিনি গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গতকাল রবিবার সকালে মিরাজের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর মগবাজারে বড় ভাই আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের বাসায়। এ সময় স্বজনদের কান্নায় সেখানে এক হূদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যেভাবে লাশ উদ্ধার ঃ খিলক্ষেত থানা পুলিশ জানায়, গতকাল শনিবার গভীর রাতে খিলক্ষেত এলাকার ফ্লাইওভারের পাশে রেললাইনের পাশে মিরাজ আহমেদের লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দেয়। তখনও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসময় তার পরনে ছিল কালো প্যান্ট, হালকা নীল রঙের গ্রামীণ চেক শার্ট ও কালো রঙের স্যু। তার শরীরে কোন ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর মিরাজের পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি বেজে ওঠে। পুলিশ ফোনে কল ধরে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। খবর পেয়ে ভাগ্নে আনোয়ারুল আজম মোহন ও সঙ্গীত শিল্পী পার্থ বড়ুয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ সনাক্ত করেন। এদিকে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেছেন, আমার ভাইকে খুন করা হয়েছে। আমি নিজেও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। এ মুহূর্তে এর বেশি আমি কিছু বলতে পারছি না। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। ঘটনাস্থল কার ঃ লাশ পড়ে থাকার খবর শুনে খিলক্ষেত ও জিআরপি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। রেললাইনের পাশে পড়ে থাকার কারণে খিলক্ষেত থানা পুলিশ জানায়, লাশটি উদ্ধারের দায়িত্ব জিআরপির। এ নিয়ে খিলক্ষেত থানা পুলিশ ও জিআরপি থানা পুলিশের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। শেষটায় নিহতের পরিবারের পক্ষে সঙ্গীত শিল্পী পার্থ বড়ুয়ার অনুরোধে খিলক্ষেত থানা পুলিশ লাশের দায়িত্ব নেয়। পরে খিলক্ষেত থানার সাব-ইন্সপেক্টর গোলাম ফারুক লাশের সুরতহাল তৈরি করেন। থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে ময়না তদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। নিহতের বড় বোন রুখসানা তানজীম বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন শুক্রবার কোথাও যায়নি মিরাজ। সারাদিন বাসাতেই ছিল। শনিবার দিনটি আমাদের জন্য ‘অপয়া’। এই দিনে পিতা, মাতা ও বড় ভাইকে হারিয়েছি। তাই জরুরি কাজ ছাড়া সাধারণত এই দিনে বাইরে বের হই না। ঘরে বসেই সময় কাটাই। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, কিন্তু মিরাজ এগুলো না মেনে বলতো- সব দিনই আল্লাহ’র। কিছুই হবে না। শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত সে ইন্টারনেটে বসে ছিল। পরে আমার রুমে এসেছে। বলছিল- ভাল লাগছে না। সিনেপ্লেক্সে একটা ভাল ছবি আছে, দেখতে যাবো। পরে ধানমন্ডিতে আড্ডা দিতে যাবো। এ কথা বলে সে বেরিয়ে যায়। রুখসানা বলেন, শনিবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়েছে। তারপর আর ফোন দেয়নি। যেখানেই থাকুক, রাত ১০টার মধ্যেই সে বাসায় ফিরতো। ১০টা পেরিয়ে গেলে ওর খবর নিতে সাড়ে ১০টায় ফোন দিয়েছি। বাজলেও কেউ ধরেনি। রাত ১১টায় আবার দিলাম, ধরল না। সাড়ে ১১ টায় ফের রিং করলাম, তাও ধরে না। তখন একটু বিরক্ত হলাম। রাত ১২টার দিকে আবারও ফোন করলে একজন ভদ্রলোক রিসিভ করেন। উনি আমার পরিচয় জানতে চান। আমি মিরাজের আপন বোন পরিচয় দিলে ওই ভদ্রলোক বলেন, আমি থানা পুলিশের লোক। আপনাকে কিছু বলতে পারব না। বাড়িতে কোন ছেলে আছে কিনা তাকে দেন। তখন বুলবুলকে ফোন করলাম। বুলবুল ওই নম্বরে ফোন করলে ওপাশ থেকে বলছিল, আপনার ভাইকে এসে নিয়ে যান। তখনও তিনি বলেননি যে, মিরাজ মৃত। রুখসানা বলেন, এই শনিবারেই মিরাজসহ পরিবারের চার সদস্য হারিয়ে গেলেন। বাবা ওয়াফিজ উদ্দিন আহম্মেদ ১৯৯৮ সালে, মা ইফাত আরা ২০১১ সাল ও বড় ভাই ইফতেখার আহম্মেদ টুলটুল ২০০২ সালের শনিবারেই মারা যান। তিনি বলেন, গত তিন বছর ধরে মিরাজ আমার কাছেই থাকতো। পিতা-মাতা না থাকায় ওকে মাতার স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতাম।