রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের শিল্প কারখানায় ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। গাড়ি ভাংচুর বা সহিংসতার আশঙ্কা থাকলে মালিকরা রাস্তায় ট্রাক নামাতে চান না। যারা গাড়ি নামাচ্ছেন, তারাও ভাড়া চাইছেন আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পণ্য সরবরাহের খরচ বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে হরতালের কারণে জাহাজে পণ্য পাঠাতে না পেরে বিমানের মাধ্যমে পাঠাতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়ে গিয়ে লোকসান গুণতে হচ্ছে। লোকসান জেনেও বিমানে পাঠানো ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ পণ্য না পাঠালে লোকসান হয় আরও বেশি।
একাধিক শিল্প মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হরতাল, অবরোধ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রায়ই শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়। ফলে সময়মতো পণ্য রফতানির জন্য শ্রমিকদেরকে ওভারটাইম করিয়ে উত্পাদন সম্পন্ন করতে হচ্ছে। ওভারটাইমে খরচ বেশি হওয়ায় এদিক থেকেও উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস-বিদ্যুত্ দিতে পারেনি, অথচ কর (ট্যাক্স) আরোপে কোন কমতি নেই। উপরন্তু ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ও ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা কঠিন করায় অনেক উদ্যোক্তাই বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়ে গেছেন। বিশেষ করে যারা নতুন বিনিয়োগ করেছেন তারা বেশ চাপের মুখে রয়েছেন। এলসি খোলার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো এখন কঠোর মনোভাব নিয়েছে । আবার ষাট দিন হলেই স্পেশাল ম্যানসন একাউন্ট (এসএমএ) হয়ে যাওয়ার নীতি খেলাপি ঋণের হারও বাড়াচ্ছে। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা কঠোর করায় গত এক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে খেলাপি ঋণ। উদ্যোক্তা ও লতিফ ফ্যাশন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণে ক্ষমতা অনুযায়ী উত্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। তার উপর ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ এবং হলমার্কের ঘটনার প্রভাবও দুশ্চিন্তায় ফেলেছেন। এদিকে সাম্প্র্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সঠিক সময়ে পণ্য উত্পাদন ও জাহাজিকরণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় পণ্য বিমানে পাঠাতে হয় বলে লোকসান গুণতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গাড়ি ভাংচুরের কারণে ট্রাক মালিকরা সব সময় রাস্তায় নামতে চাইছেন না। যারা গাড়ি নামাচ্ছেন তাদেরকে ভাড়া কয়েকগুণ বেশি দিতে হচ্ছে। একদিকে সময়মত উত্পাদন সম্পন্ন করতে ওভারটাইম দিয়ে কাজ করানোতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তার ওপর বিমানে পণ্য পাঠানোর কারণে লোকসানও গুণতে হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান না হলে শিল্প উদ্যোক্তারা টিকতে পারবে না।
ট্রাকের ভাড়া বাড়ানোর প্রসঙ্গে ট্রাক মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা রাস্তায় যানবাহন নামাতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ হরতালের সময় ছাড়াও গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটছে। এতে তারা রাস্তায় গাড়ি নামাতে ভয় পাচ্ছেন। এরপরও ব্যাংক ঋণ পরিশোধের তাগিদে গাড়ি নামালেও ভাড়া বেশি নিয়ে কম ট্রিপ করাচ্ছেন।
শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কটের পাশাপাশি সামপ্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পণ্য উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ফলে অনেকেই নতুন করে অর্ডার নিতে ভয় পাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের শিল্প উদ্যোগ ও রফতানি খাত ব্যাহত হবে, প্রভাবিত হতে পারে শ্রমিকরাও। এতে গোটা অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়ে যেতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই ভাবে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সামগ্রিক অর্থনীতিতে ক্রমেই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অর্থনীবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা অর্থনীতির জন্য মোটেই সহায়ক নয়। ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে গতি ধরে চলতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতি তার জন্য মোটেই অনুকূলে নয়। তাই রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
এদিকে, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া এক চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা নমনীয় করার সুপারিশ করেছেন। এই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্যও শিল্প উদ্যোক্তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
