উত্তপ্ত চট্টগ্রামের রাজপথ

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ২২:২৪
গণজাগরণ মঞ্চের মহাসমাবেশ, সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ও জামায়াত বিরোধী হিসাবে পরিচিতি ১০ আলেমকে হত্যার হুমকি নিয়ে উত্তপ্ত চট্টগ্রামের রাজপথ। জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে ঠেকাতে বিরোধী পক্ষ এখন একাট্টা। বিভিন্ন সংগঠন প্রতিদিন নানা কর্মসূচি পালন করছে। আগামী বুধবার চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের মহাসমাবেশের দিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। রাজনৈতিক এসব কর্মসূচি নিয়ে জনমনে আতংক বিরাজ করছে। চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকায় ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া হিন্দু সমপ্রদায়ের বসতঘরে আগুন, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, নির্যাতনের প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও মিছিল সমাবেশ করে চলেছে। আগামী ১৬ মার্চ লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ। পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তপন কান্তি দাশ জানান, সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগম ঘটানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এসব সহিংস ঘটনার জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে সামপ্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মহাসচিব অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত ইত্তেফাককে বলেন, শিগগিরই আমরা কর্মসূচি ঠিক করে ঘোষণা দেব। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলনরত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তারা আগামী ১৩ মার্চ বুধবার চট্টগ্রামে আসছেন। তারা ঐদিন সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে গণজাগরণ চত্বরে সমাবেশ করবেন। এই সমাবেশটি লালদীঘির ময়দানে হওয়ার কথা ছিল। তবে গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা শরীফ চৌহান জানান, লালদীঘির ময়দানে মহাসমাবেশের ঘোষণা ঢাকা থেকে দেয়া হয়েছিল। তার পরিবর্তে আমরা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সমাবেশকে ঘিরে গণজাগরণ মঞ্চ বিরোধী শক্তি সোচ্চার হয়ে উঠেছে। হরতাল ও ষড়যন্ত্র প্রত্যাখ্যান করে সমাবেশ সফল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে চট্টগ্রামের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তারা। গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে ‘সমমনা ইসলামী দলগুলো’। সমমনা ইসলামী দলগুলো মাঠে নামার ব্যাপারে জামায়াত-শিবিরের ইন্ধন রয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে। চট্টগ্রামে বহুসংখ্যক কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। ধর্মীয় আকিদা নিয়ে তাদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব দীর্ঘদিনের। সমপ্রতি সময়ে তাদের দূরত্ব অনেক কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ব্লগারদের প্রতিহত করতে হরতাল দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের মাটিতে তাদের স্থান হবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির শীর্ষ এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ইতিপূর্বে সমমনা ইসলামী দলগুলোর সমাবেশ ও মিছিলগুলোতে জামায়াত-শিবিরের উপস্থিতি ছিল বেশি। তাদের সামনে রেখে নাশকতার চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াত-শিবির। ফলে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে বড় ধরনের নাশকতার আশংকা করছেন তারা। এদিকে ১০ আলেমকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পর মাঠে নেমেছে প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে জামায়াতে ইসলামী বিরোধী ইসলামিক ফ্রন্ট, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও গাউসিয়া কমিটি। চট্টগ্রামে এই সংগঠনের প্রচুর জসমর্থন রয়েছে। এই সংকটের আলেমদের হত্যার পরিকল্পনার জন্য প্রতিদিন নগরীর কোন না কোন এলাকায় মানববন্ধন, মিছিল ও সমাবেশ করছে তারা। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি করছেন তারা। এ প্রসঙ্গে ১০ আলেমের অন্যতম ও অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন আল কাদেরী ইত্তেফাককে বলেন, জামায়াত-শিবিরের শাস্তির দাবি করে আমরা সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছি। কয়েকদিনের মধ্যে বসে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করবো। অন্যদিকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, নাশকতা ঠেকাতে উপজেলা ও মহানগরীতে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তার আলোকে চট্টগ্রামে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এসব কমিটিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াও ইমাম, শিক্ষক, পেশাজীবীদের প্রতিনিধি রাখা হবে। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম আবদুল কাদের বলেন, কয়েকটি উপজেলায় কমিটি গঠিত হয়েছে। বাকিগুলোতে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া প্রতিটি মসজিদের ইমাম ও খতিবদের নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন মতবিনিময় করেছে। তাদের জামায়াত-শিবিরের ইসলাম বিরোধী ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বলা হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ বিরোধী প্রচারপত্র উদ্ধার নগরীর একটি ছাপাখানায় অভিযান চালিয়ে সরকার ও গণজাগরণ মঞ্চবিরোধী বিপুল পরিমাণ প্রচারপত্র জব্দ করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার দুপুর দুইটায় কোতোয়ালি থানার মোমিন রোড এলাকার একটি ছাপাখানা থেকে এসব প্রচারপত্র জব্দ করা হয়। ইসলামী ছাত্র শিবিরের নামে প্রকাশিত এসব প্রচারপত্রে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ও গণজাগরণ মঞ্চের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। গণজাগরণ মঞ্চ মেনে নেবেন না বিএনপি-জামায়াত পন্থি শিক্ষকবৃন্দ চবি প্রতিনিধি জানান, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গঠিত গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেনে নেবেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াত পন্থি শিক্ষকবৃন্দ। আগামী বুধবার ঢাকার বাইরে প্রথমবারের মত গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ‘গণহত্যা ও গণ গ্রেফতারের’ প্রতিবাদে গতকাল এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাদা দলের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. কেএম গোলাম মহিউদ্দিন, প্রফেসর ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, প্রফেসর ড. সিদ্দিক আহমহ চৌধুরী, প্রফেসর ড. আ ন ম মুনির আহমদ, প্রফেসর ড. হাসান মোহাম্মদ ও আতিকুর রহমান। ইমরান এইচ সরকার অবাঞ্ছিত ঘোষণা ‘আল্লাহ ও রাসুল (স.) এবং কুরআনের অবমাননা, স্কুলের ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বইয়ে আল্লাহর সাথে দেবদেবীকে শরিক করা, শাহবাগ আন্দোলনের নামে ইসলামের নামাজ, রোজা, কুরবানী ও পর্দাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিথ্যাচার’ এবং নাস্তিক, মুরতাদ ও ইসলাম বিদ্বেষীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে বুধবার বৃহত্তর চট্টগ্রামে পূর্ণ দিবস হরতাল আহ্বান করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এদিকে, হরতাল সফল করার জন্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে চট্টগ্রামের ইসলামী দল সমূহের নেতৃবৃন্দ এক যুক্ত বিবৃতি প্রদান করেন। বিবৃতিতে তারা শাহবাগের অন্যতম সংগঠক ইমরান এইচ সরকারকে চট্টগ্রামে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।