নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না তার সহপাঠী ও স্কুলের শিক্ষকরা। গতকাল রবিবার সকালে শহরে প্রচণ্ড খরতাপের মধ্যে দীর্ঘ মানববন্ধন করে তারা ত্বকি হত্যার বিচার ও খুনিদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে বঙ্গবন্ধু সড়কে সকাল সাড়ে ১০টা হতে ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনটি ছড়িয়ে পড়ে প্রেসক্লাব হতে চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত। ত্বকির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এই মানববন্ধন আয়োজন করলেও উপস্থিত হয়েছিল মাউন্ট রয়েল একাডেমী, এরিবস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ফিলোসোফিয়া স্কুল ও বেইলী স্কুলের শত শত শিক্ষার্থী। এসেছিল তার সহপাঠীরাও। মানববন্ধনে ত্বকির সহপাঠীদের শান্ত করতে পারেননি স্কুলের শিক্ষকসহ অন্য অভিভাবকরা। তাদের কান্না থামাতে গিয়ে অনেকে নিজেই কেঁদে ফেলেন।
মানববন্ধনে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শঙ্কর রায়, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর জেলা কমিটির সভাপতি জাহিদুল হক ভুঁইয়া দিপু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ধীমান সাহা জুয়েল, অসিত বরণ বিশ্বাস, মনি সুপান্ত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জাগো ফাউন্ডেশন নামের একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের লোকজনও ছিল সেখানে।
এবিসি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল হাই বলেন, ‘ত্বকির মতো মেধাবী একটি ছেলে এভাবে হত্যার শিকার হবে তা মেনে নিতে পারছি না।’ সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মাওলা জানান, ‘বৃহস্পতিবার ত্বকির ‘এ লেভেল’ পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। সে খুব ভাল ফলাফল করে। পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে সে সারাদেশে সর্বোচ্চ ২৯৭ নম্বর পেয়েছে। অথচ এই ফল সে দেখে যেতে পারলো না।’
ঢাকার শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জে গড়ে তোলা গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা জেলার বিশিষ্ট সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকিকে (১৭) অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। শুক্রবার সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বুধবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল মেধাবী শিক্ষার্থী ত্বকি। এ ঘটনায় শনিবার নারায়ণগঞ্জে নজিরবিহীন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। গতকাল পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা, আজ ডিসি অফিস ঘেরাও
এদিকে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকির খুনিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে ৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জেলা সন্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। গতকাল বিকালে শহরের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ শেষে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে: আজ ১১ মার্চ সোমবার সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালায় ঘেরাও ও স্মারক লিপি প্রদান, ১২ মার্চ মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় শহীদ মিনারে নাগরিক শোকসভা, ১৩ মার্চ বুধবার দিনব্যাপী এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ, ১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় শহীদ মিনারে ছাত্র সমাবেশ ও ১৫ মার্চ শুক্রবার বিকাল ৪টায় শহীদ মিনারে গণজমায়েত।
খেলাঘর জেলা শাখার সভাপতি রথিন চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি এড. প্রদীপ ঘোষ বাবু, ভবানী শংকর রায়, উদীচীর জেলা সভাপতি জাহিদুল হক দীপু, সিপিবির জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, বাসদ-এর জেলা সমন্বয়ক নিখিল দাস, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা তরিকুল সুজন, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সম্পাদক হিমাংসু সাহা, ন্যাপের আওলাদ হোসেন, মহিলা পরিষদের জেলা সভাপতি লক্ষ্মী চক্রবর্তী, সমগীতের অমল অকাশ, খেলাঘরের জহিরুল ইসলাম, ছাত্র ফ্রন্টের সজল বাড়ৈ, ছাত্র ইউনিয়নের অনিন্দ্য সাহা তুলতুল, ছাত্র ফেডারেশনের রফিকুল বাপ্পি প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, সকল প্রগতিশীল আন্দোলন থেকে রফিউর রাব্বিকে নিবৃত্ত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে তার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নারায়ণগঞ্জে একটার পর একটা হত্যকাণ্ড ঘটছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। তারা অবিলম্বে ত্বকির হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
