দেশজুড়ে সহিংসতা বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে জেলা জামায়াতের আমির মওলানা মাইনুদ্দিন আহমেদ ও সিলেট থেকে জামায়াত সমর্থক এক শিক্ষককে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া কয়েকটি স্থানে দলটির বেশ কয়েকজন নারী কর্মীকে আটক করা হয়েছে। আটকদের হরতাল চলাকালে সহিংসতার অভিযোগে বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীরসহ ৫ জনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রবিবার বিকালে শহরের মিশনপাড়া এলাকায় অবস্থিত জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয় থেকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম তাদের আটক করে নিয়ে যায়। পরে তাদের জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
আটককৃতরা হলেন- জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমাদ, সেক্রেটারী জেনারেল মমিনুল হক, মহানগর শাখার সেক্রেটারী ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হক, দলের সোশ্যাল উইংস-এর সমন্বয়ক ইকবাল আহম্মেদ শ্যামল ও সংগঠক জাকির হোসেন।
জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, দেশে চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিসহ গুপ্ত হত্যা এবং বিভিন্ন অভিযোগে এদের আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এসপি আরো জানান, ত্বকি হত্যায় জামায়াতের এসব নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কী না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে আহত করা এবং নাশকতার অভিযোগে রবিবার জামায়াতে ইসলামী রংপুর মহানগর কর্মপরিষদ সদস্য ও কোতয়ালী থানার আমীর অ্যাডভোকেট কাওসার আলীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিকালে নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সিলেট অফিস জানায়, কোতয়ালী ও বিমানবন্দর থানা যৌথ অভিযান চালিয়ে নগরীর সুবিদবাজার বনকলাপাড়া এলাকা থেকে রবিবার ভোরে তিন সহোদরসহ জামায়াত-শিবিরের ৪ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র ছাড়াও জামায়াত-শিবিরের বেশ কিছু প্রকাশনা, পোস্টার ও দলীয় বইপত্র জব্ধ করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে ৯টি লম্বা কিরিচ ও ৪টি কাঠের রুল রয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে- দক্ষিণ সুরমার কদমতলী স্টার লাইট কলেজের প্রভাষক ও বিয়ানীবাজার উপজেলার ইনামপুর গ্রামের আনিছুর রহমানের পুত্র মহি উদ্দিন (২৭), রফি উদ্দিন (২০) ও শাফি উদ্দিন এবং কানাইঘাট উপজেলা দীঘিরপার গ্রামের আনিছুর রহমানের ছেলে তারেক (১৮)। এ ব্যাপারে এয়ারপোর্ট থানায় মামলা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, হরতালে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে গতকাল জেলার বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবিরের মহিলা কর্মীসহ ১৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর থানায় ৬ জন, শ্যামনগরে ২ জন, কলারোয়ায় ৬ জন, পাটকেলঘাটায় ১ জন ও দেবহাটায় ১ জন আটক হয়েছে। সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে হরতালে নাশকতা সৃষ্টি, পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধাদানের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, ভোরে মহিলাসহ জামায়াতের ৬ কর্মী-সমর্থককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন, উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামের আজিজ মোড়লের ছেলে আঃ রশিদ মোড়ল, মুরারীকাটি গ্রামের মান্নান মিস্ত্রির ছেলে শহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম মিস্ত্রি, নেছার আলী মোড়লের ছেলে আলীমদ্দিন, নজরুল ইসলামের স্ত্রী আরিফা বেগম ও পুটুনি গ্রামের আনছার আলীর ছেলে আনারুল ইসলাম। গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, রবিবার জেলার ৫ উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১ জন উপজেলা জামায়াতের উপদেষ্টা ও ১ জন ইউনিয়ন জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক। বাকিরা জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থক। এ নিয়ে বগুড়ায় তান্ডবের সাথে জড়িত অভিযোগে গ্রেফতারের সংখ্যা একশ’ তে দাঁড়ালো ।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক জানান, জেলায় স্মরণকালের বর্বোরচিত তান্ডবের ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, সেসব মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে ওই ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দুপচাঁচিয়া (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার ঘটনায় গত রবিবার পর্যন্ত পৌর কাউন্সিলরসহ ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আটকদের মধ্যে ৫নং ওয়ার্ড পৌর কাউন্সিলার সাবেক জামায়াত নেতা মোহাম্মদ আলী ও কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মী রয়েছেন। থানার অফিসার ইনচার্জ মুনিরুল ইসলাম গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বেলকুচি ও এনায়েতপুর থেকে ৭ জামায়াত-শিবির কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। সম্প্রতি বাঐতারায় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে এজাহারভুক্ত আসামি সোহেলকে আটক করা হয়। এছাড়া এনায়েতপুর এবং বেলকুচিতে মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় শনিবার রাতে জাকারিয়া, আনোয়ার হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, রাকাতুল্লাহ, ইসমাইল হোসেন ও আবু সাঈদকে আটক করে পুলিশ।
লালপুর (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, নাটোরের লালপুর উপজেলার কদিমচিলান গ্রামে জামায়াত-শিবিরের হামলায় যুবলীগ নেতা নিহত ও পুলিশের গাড়ী ভাংচুরের ঘটনার পর থেকে ১১ দিন ধরে কদিমচিলান ও গোদড়া গ্রামে ১৪৪ ধারা বলবত্ রয়েছে। এ ঘটনায় ২ মামলায় শনিবার মহিলাসহ ১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) সংবাদদাতা জানান, পুলিশ গত ২ দিনে ১০ জামায়াত-শিবির-সমর্থককে আটক করেছে। গত ৩ মার্চ পাঁচবিবি থানায় হামলা, গুলি বর্ষণ ও ইউএনও’র গাড়ীতে হামলার অভিযোগে এদের গ্রেফতার করা হয়।
রামগতি সংবাদদাতা জানান, লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারী মাওলানা নুর উদ্দিনকে গতকাল দুপুরে পুলিশ উপজেলার হাজিরহাট আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকে গ্রেফতার করেছে। একটি সংঘর্ষের ঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ দুলালের দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। গতকালই আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, রংপুরের পীরগাছায় গতকাল বিকালে উপজেলার সাতদরগাহ বাজার থেকে অন্নন্দানগর ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী ও একটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করছে পুলিশ।
সেনবাগ সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালীর সেনবাগ থানা পুলিশ উপজেলার কেশারপাড় ইউনিয়নের জামায়াতের আমির আবুল কাশেমকে (৪৫) তার গ্রামের বাড়ি কেশারপাড় গ্রাম থেকে গতকাল ভোরে গ্রেফতার করেছে। আবুল কাশেম স্থানীয় কানকিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী। তাকে গতকাল দুপুরে নোয়াখালীর বিচারিক আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
সীতাকুন্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, হরতালে বাড়বকুন্ড রেলস্টেশন পোড়ানো, বারআউলিয়ায় রেললাইনের বিট কেটে নিয়ে যাওয়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্নস্থানে একাধিক গাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া ও শতাধিক গাড়ী ভাংচুরের ঘটনায় পৃথক সাতটি মামলা হয়েছে। আর এতে দেড়শ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরা সবাই জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মী। সীতাকুন্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামিউল আলম ঘটনায় জানান, সত্যতা স্বীকার করে আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষের মামলায় ১৮ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে এবং রবিবার অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেফতার করা হয়। আটকদের মধ্যে সদরের কাদোয়া কাঁকড়াপাড়ার দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মওলানা আবুল বাশার রয়েছেন।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, সহিংসতায় জড়িত অভিযোগে গতকাল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ ৬ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতদের পুলিশের উপর হামলা ও রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে থানায় দায়ের করা মামলার আসামি হিসেবে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, পুলিশের দায়েরকৃত ৭ মামলায় ১৮ দলীয় জোটের প্রায় আড়াই হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার আতংকে এ উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ জনপদ এখন পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে।
