রান শেষ করেই জড়িয়ে ধরলেন সঙ্গী নাসির হোসেনকে; ট্রেডমার্ক হাসিতে ঝরে পড়লো আত্মবিশ্বাস। ব্যাট উঁচু করে দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দিলেন, সিজদা করলেন পিচে। তৈরি হয়ে গেল এক ইতিহাস। পুরো বাংলাদেশ যে দৃশ্যত সবকিছু ভুলে অভিবাদন জানাল ইতিহাস তৈরির নায়ক মুশফিকুর রহিমকে। অভিনন্দন জানানোরই কথা—বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হয়ে গেলেন মুশফিকুর রহিম।
আর মুশফিকুর, আশরাফুল, নাসির হোসেনদের ইতিহাস গড়ার এই দিনে শ্রীলংকার ৫৭০ রানের জবাবে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে অল-আউট হওয়ার আগে করল ৬৩৮ রান। চতুর্থ দিনের খেলা যখন শেষ হলো, শ্রীলংকা ৬৮ রান পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দফা ব্যাটিংয়ে নেমে করে ফেলেছে ১ উইকেটে ১১৬ রান।
এ ম্যাচে পারফরম্যান্সের জন্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মুশফিককে ৪ লাখ, আশরাফুলকে ৩ লাখ ও নাসিরকে ২ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ৬৩৮ রানের এই ইনিংসটি বলাই বাহুল্য, দেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। শ্রীলংকার বিপক্ষে যে কোনো দলের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসও এটি। ১৯৬ ওভার মেয়াদী এই ইনিংসটি ওভারের দিক থেকে বাংলাদেশের দীর্ঘতম। এই প্রথম বাংলাদেশের তিন জন ব্যাটসম্যান এক ইনিংসে সেঞ্চুরি করলেন। এমন অনেক রেকর্ডে রাঙ্গানো রইল এই গল টেস্ট।
গতকাল দিনের শুরুটা অবশ্য হতাশারই ছিল। গল টেস্টের তৃতীয় দিনে অপরাজিত ছিলেন ১৮৯ রানে; মাত্র ১১ রান হলেই ইতিহাসের পাতায় নাম উঠে যায় আশরাফুলের। তবে, ১১ রানের রাস্তাটাকে অনেক দূরের পথ মনে হলো আশরাফুলের। মাত্র এক রান যোগ করে ফিরলেন রঙ্গনা হেরাথের বলে; নাকি হার মানলেন স্নায়ুচাপের কাছে?
স্নায়ুচাপ, দর্শকের চাপ, প্রতিপক্ষের চাপ; যে কারণেই হোক; বাংলাদেশের কোটি মানুষের হূদয় ভেঙে দিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি থেকে ১০ রান দূরে থাকতে ফিরে এলেন আশরাফুল। আশরাফুলের এই বিদায়ে নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছিলেন সঙ্গী মুশফিকও। তখন সেই মুশফিককে ঘিরেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করল বাংলাদেশ। স্বপ্ন সত্যি করে দিলেন মুশফিক। মাত্র দ্বিতীয় অধিনায়ক উইকেট রক্ষক হিসেবে মুশফিকের এই ইনিংস ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় উঠে গেল। তৃতীয় দিন থেকেই ছিলেন উইকেটে; ৩২১ বলের ইনিংসে আছে ২২টি চার ও ১টি ছয়।
বাকিটা সময় রাজত্ব চালিয়ে গেলেন নাসির হোসেন; পেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত সিরিজেই পর পর দুই টেস্টে আউট হয়েছিলেন ৯৬ ও ৯৪ রানে। তবে গলের ব্যাটিং স্বর্গে এবার আর খালি হাতে ফিরতে হলো না নাসিরকে। মাত্র সপ্তম টেস্টেই দেখা পেলেন সেঞ্চুরির। ২০০ রান করার পরেই অধিনায়কের বিদায় ঘটলে সেখান থেকে টেল এন্ডারদের সাথে নিয়ে দলের লিড বাড়িয়ে নেন এই ব্যাটসম্যান। আগের ছয়টি টেস্টেও পেয়েছেন চারটি হাফ সেঞ্চুরি। মোট রান ৯৪২। সাত নম্বর পজিশনে এমন একজন খেলোয়াড়কে পাওয়া যে কোনো টেস্ট দলের জন্যই ভাগ্যের ব্যাপার!
ব্যাটিং কৃতিত্ব এখানেই শেষ হচ্ছে না বাংলাদেশের। আট নম্বরে নেমে সোহাগ গাজী করেছেন ২১ রান; টেস্টে তার আগের সর্বোচ্চ স্কোর ১৮। অভিষিক্ত দুই ব্যাটসম্যান এনামুল হক (১৩) ও মমিনুল হককে (৫৫) বাদ দিলে এই ম্যাচে বাংলাদেশের হয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ রানের স্কোর গড়লেন মোট চারজন ব্যাটসম্যান।
বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটাতে লংকান অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস ব্যবহার করেছেন মোট সাত জন বোলার। দুইটি করে উইকেট পেয়েছেন কুলাসেকারা, মেন্ডিস, হেরাথ, এরাঙ্গা ও দিলশান।
দিনের শেষ ভাগে শ্রীলংকা ব্যাটিং করার সুযোগ পেয়েছে ৩০ ওভার। ৬৩ রান করে অপরাজিত আছেন ওপেনার তিলকারত্নে দিলশান; হাফ সেঞ্চুরি থেকে এক রান দূরে আছেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান কুমারা সাঙ্গাকারা। এই দুই ব্যাটসম্যানের উপর ভর করে স্বাগতিকরা তুলেছে ১১৬ রান। টেস্টে ৩.৮৬ রেটে রান তোলার ধরন দেখলেই বোঝা যায়, গল টেস্টের এখানেই শেষ দেখছে না লংকানরা। রেকর্ড নিয়ে ছেলেখেলার ম্যাচে বাংলাদেশও চাইবে না কোনো অঘটন ঘটুক। ১৬ কোটি মানুষও চাইবে না মাথা নিচু করে ফিরতে!
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান
রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
৬৩৮ শ্রীলঙ্কা গল ২০১৩
৫৫৬ উইন্ডিজ ঢাকা ২০১২
৪৮৮ জিম্বাবুয়ে চট্টগ্রাম ২০০৫
বাংলাদেশের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ
রান ব্যাটসম্যান প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
২০০ মুশফিকুর রহিম শ্রীলঙ্কা গল ২০১৩
১৯০ মোহাম্মদ আশরাফুল শ্রীলঙ্কা গল ২০১৩
১৫৮* মোহাম্মদ আশরাফুল ভারত চট্টগ্রাম ২০০৪
১৫১ তামিম ইকবাল ভারত ঢাকা ২০১০
বাংলাদেশের সেরা টেস্ট জুটি
ব্যাটসম্যান জুটি রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু
আশরাফুল-মুশফিক ৫ম ২৬৭ শ্রীলঙ্কা গল
তামিম-জুনায়েদ ২য় ২০০ ভারত ঢাকা
আশরাফুল-মুশফিক ৬ষ্ঠ ১৯১ শ্রীলঙ্কা কলম্বো
গলে সর্বোচ্চ রান
রান দল প্রতিপক্ষ সাল
৬৩৮ বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ২০১৩
৬০০/৮ (ডি.) পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা ২০০০
৫৯০/৯ (ডি.) শ্রীলঙ্কা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০০১
অধিনায়ক-উইকেটরক্ষকের সেরা ইনিংস
রান খেলোয়াড় দল প্রতিপক্ষ সাল
২২৪ মহেন্দ্র সিং ধোনি ভারত অস্ট্রেলিয়া ২০১৩
২০০ মুশফিকুর রহিম বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ২০১৩
১৬৪ অ্যালেক স্টুয়ার্ট ইংল্যান্ড দ. আফ্রিকা ১৯৯৮
