বিএনপি অফিসে অভিযান :ফখরুল খোকাসহ আটক শতাধিক

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৩, ২২:৪২
রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘেরাও করে নজিরবিহীন তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। পাঁচতলা ভবনের প্রতিটি তলার দরজা ভেঙ্গে পুলিশ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস-চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, ভাইস-চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, আমান উল্লাহ আমান ও মো. শাহজাহান এবং দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ সেখানে থাকা সব নেতা-কর্মীকে আটক করেছে। অফিসের ভেতর ও বাইরে থেকে শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ দাবি করেছে, তল্লাশিকালে বিএনপির কার্যালয়ের ভেতর থেকে ৬টি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে গতকাল সোমবার বিকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ১৮ দলের বিক্ষোভ সমাবেশের শেষদিকে বিকাল পাঁচটায় নাইটেংগেল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণের জের ধরে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছুঁড়ে সমাবেশ পণ্ড করে দেয় পুলিশ। সমাবেশ পণ্ড করে দেয়া এবং নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৮ দল আজ মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান করেছে। মির্জা ফখরুলের নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই হরতাল শুরু হয়ে যায়। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে এই প্রথমবারের মত প্রধান বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এভাবে তল্লাশি চালানো এবং উপস্থিত সকল নেতা-কর্মীকে আটক করার ঘটনা ঘটলো। এর আগে গত সপ্তাহে রবিবার ও সোমবার জামায়াতের ডাকে এবং মঙ্গলবার বিএনপির ডাকে সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। সমাবেশ পণ্ড করা এবং নেতা-কর্মীদের উপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবারও হরতাল পালন করে ১৮ দলীয় জোট। মির্জা ফখরুলসহ শীর্ষ নেতাদের ছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পুলিশ বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, দলীয় এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানাসহ উপস্থিত সকল নারী কর্মীকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও টানা-হ্যাঁচড়ার সময় নারী কর্মীরা আতঙ্কে চিত্কার ও কান্নাকাটি করতে থাকেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে পুলিশের তল্লাশির ঘটনায় সেখানে এক ভীতিকর ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একইসময়ে পুলিশ ১৮ দলের শরিক জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কার্যালয়ও অবরুদ্ধ করে রাখে। তল্লাশির সময় পুলিশ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রতিটি ফ্লোরের প্রত্যেক কক্ষে হানা দেয়। ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়, তৃতীয় তলায় মহাসচিবের কার্যালয় এবং সম্মেলন কক্ষ ও দপ্তর সম্পাদকের কক্ষের দরজা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে পুলিশ সকল নেতা-কর্মীকে একে একে ধরে নিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেয়। পুলিশের অভিযান শেষে বিএনপির কার্যালয়সহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করে। যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীসহ সারাদেশে সাধারণ মানুষ হত্যা, সরকারের নির্যাতন ও হামলা-মামলার প্রতিবাদে এবং সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিকাল ৩টায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ১৮ দলের বিক্ষোভ সমাবেশ চলছিল। এতে সভাপতিত্ব করছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা। ১৮ দলের বিএনপির শরিক দলের নেতারাসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা এতে বক্তব্য রাখেন। সাদেক হোসেন খোকা সভাপতির বক্তব্য শেষ করেন বিকাল পাঁচটার কয়েক মিনিট আগে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। খোকার বক্তব্য শেষেই সমাবেশের প্রধান ও সর্বশেষ বক্তা হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি মাইকের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশ স্থলের অদূরে নাইটেংগেল মোড়ে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এসময় সমাবেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ ছোটাছুটি শুরু করেন। ১৮ দলের উপস্থিত নেতা-কর্মীরা শ্লোগান দিতে থাকেন। এ রকম হট্টগোলের মধ্যেই আজ হরতালের ঘোষণা দিয়ে সমাবেশ সমাপ্ত করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার ঘোষণার পরপরই নেতা-কর্মীরা ‘হরতাল-হরতাল’ বলে শ্লোগান দিতে থাকেন। এসময় সেখানে টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয় নেতা-কর্মীরা। তারা আশপাশের ভবনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল ছুঁড়ে এবং গরম পানি ছিটিয়ে সমাবেশ পণ্ড করে দিলে বিএনপিসহ ১৮ দলের নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান নেন। অনেকে দৌড়ে আশপাশের গলিতে চলে যান। যেভাবে পুলিশি অভিযান বিক্ষোভ সমাবেশ পণ্ড হয়ে গেলে ঘণ্টাখানেক পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুলিশ বিএনপি কার্যালয়ের ভেতরে হানা দেয়। এ সময় মির্জা ফখরুল ছিলেন দলীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় তার দপ্তরে। সেখান থেকে সোয়া ছয়টার সময় তাকে ধরে নিয়ে আসে পুলিশ। দলীয় কার্যালয়ের সামনে থাকা পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যানে ফখরুলকে তুলতে গিয়েও প্রথমে না তুলে তাকে কার্যালয়ের ভেতরে আনা হয়। কিছুক্ষণ পর আবার একই ভ্যানে তাকে ধাক্কা মেরে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এসময় পুলিশের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের বেশ কিছুক্ষণ টানা হেঁচড়া চলে। মির্জা ফখরুলকে নিয়ে যাবার পর সাড়ে ৬টার দিকে রুহুল কবীর রিজভীকেও কার্যালয় থেকে ধরে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। এরপর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মির্জা আব্দুল লতিফ জনিকে আটক করা হয়। পরে মহাসচিবের কক্ষ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙ্গে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট থেকে একে-একে আটক করা হয় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, সাবেক ছাত্রনেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও সাদেক হোসেন খোকা, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্যাহ আমান ও যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাইফুল ইসলাম টিপুসহ বেশ কয়েকজনকে। এর কয়েক মিনিট পর মহিলা পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় সেলিমা রহমান, নিলোফার চৌধুরী মনি ও শিরিন সুলতানাসহ নারী নেতা-কর্মীদের। বিএনপির কার্যালয়ের ভেতর থেকে নেতা-কর্মীদের আটক ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে আরো অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে জামায়াতের দুই-তিনজন নেতাকর্মীও আছেন। আন্দোলন চালিয়ে যান: ফখরুল প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় মির্জা ফখরুল ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীকে এ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এসময় সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রকে হত্যা করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছি। তারপরেও আমাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ তিনি এ সময় পুলিশের কাছে জানতে চান কার নির্দেশে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন ‘আপনাদের অফিসার কোথায়, তাকে ডাকুন।’ এটা স্বৈরাচারী সরকার: খোকা আটকের সময় সাদেক হোসেন খোকা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা একটি স্বৈরাচারী সরকার। তারা গণতন্ত্রের কোনো তোয়াক্কা করে না। সরকার মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনাকে ধুলিসাত্ করে দিয়েছে। তারা পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছে। আজকের ঘটনাই এর প্রমাণ। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ’৭১ এ একজন রাজাকার ছিলেন। এই সরকারই শেষ সরকার নয়।’ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এক দফার আন্দোলন জোরদার করে বর্তমান সরকারকে হটিয়ে গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধার করতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। জয়নুল আবদিন ফারুক প্রিজন ভ্যানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, সরকারের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলতে থাকবে। আটকের সময় একই কথা বলেন রিজভীও। পুলিশের বক্তব্য বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সকল নেতা-কর্মী আটক ও আড়াই ঘণ্টার অভিযানের নেতৃত্ব দেন পুলিশের মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান। অভিযানের শুরুতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির পুরো কার্যালয় চার্জ করবো। এটা করবো যেন নতুন কোনো অঘটন না ঘটতে পারে। মেহেদী জানান, বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলছিল। এসময় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নাইটেঙ্গেল মোড়ে দীর্ঘসময় ধরে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল, ইট-পাটকেল ছুঁড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এরই প্রেক্ষিতে আমরা বিএনপির কার্যালয়ে তল্লাশি চালাচ্ছি। এখানে যারা রয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে আটক করে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের এই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের উদ্দেশে আরো বলেন, আপনারা দেখেছেন পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘসময় ধরে ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছে। পুলিশ চেয়েছে এখানে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য আমরা কাজ করছি। আমাদের ওপর যেন কোনো মিথ্যা দোষ না পড়ে। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করেছি। তার দাবি, আজ হরতাল দেয়ার জন্যই বিরোধী দল নয়াপল্টনে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। যার কারণে বিস্ফোরণের পরপরই হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।