দেশে যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হইবার ফলে জনসাধারণের উদ্বেগও বাড়িতেছে। এই উদ্বেগ তাহাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্যই শুধু নহে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবিয়াও তাহারা উদ্বিগ্ন। হত্যা, খু্ন ও গুমের ঘটনা যেই হারে ঘটিতেছে তাহাতে স্বস্তিতে দিনাতিপাত করা দুরূহ হইয়া পড়িয়াছে। হরতাল, সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও অব্যাহত রহিয়াছে। গত ৭১ দিনে ১৪ দিনই দেশব্যাপী হরতাল সংঘটিত হইয়াছে। জেলাভিত্তিক হরতালও হইয়াছে। এই ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি যে অর্থনীতিকেও বাধাগ্রস্ত করিয়া থাকে, তাহা না বলিলেও সকলেই বুঝিবেন। আর ব্যবসায়ী-শিল্পউদ্যোক্তা মহলের মনের অবস্থা যে কি, তাহাও আঁচ করিতে সচেতন মানুষের কষ্ট হইবে না। যাহারা শিল্পের চাকা ঘোরান, শ্রমের যোগান দেন, শ্রমিকের মজুরি দেন তাহাদের জন্য সংঘাতময় পরিস্থিতি মোটেই সহায়ক নহে। হরতাল আর নৈরাজ্য চলিলে অর্থনীতি কিভাবে পথ হাঁটিবে? আর অর্থনীতি যদি হোঁচট খাইয়া মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়া যায়, তাহা হইলে সরকার কিংবা বিরোধীদল কাহারো জন্যই তাহা শুভ হইবে না। এমনিতেই আমাদের দেশের অর্থনীতি নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে।
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাগণ এই বিষয়ে সজাগ করিয়াছেন। তাহারা নানান ভাবে বুঝাইবার চেষ্টা করিতেছেন যে, ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পরিহার না করিলে তাহা মঙ্গলজনক হইবে না। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন যেই অবস্থায় রহিয়াছে, তাহাতে আমাদের টিকিয়া থাকিতে হইলে অধিকতর প্রতিযোগিতাসক্ষম হইতে হইবে। রফতানি ও রেমিটেন্সের ওপর ভর করিয়া আমরা অর্থনীতিকে যতদূর টানিয়া নিতে পারিয়াছি, তাহাও অব্যাহত রাখিতে হইলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করিবার বিকল্প নাই। রফতানি খাতে আয় বাড়াইতে হইলে পণ্যের গুণগত মানও বাড়াইতে হইবে। সময়মত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করিতে হইবে। উপরন্তু, প্রতিযোগিতা করিয়া বাজার ধরিয়া রাখিতে হইলে কমাইতে হইবে পণ্যের দাম। তবেই আমাদের রফতানির পরিমাণ বাড়িবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাহা কি সম্ভব?
হরতাল আর সংঘাত যাহাই বলি না কেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাড়িয়া যাইতেছে পণ্যের উত্পাদন খরচ। হরতালের কারণে শিল্পের শ্রমিকদের ওভারটাইম যেমনি দিতে হয়, তেমনি পরিবহন খরচও বাড়িয়া যায়। রফতানির ক্ষেত্রে জাহাজে পণ্য পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই সময়মত পণ্য পাঠাইতে আকাশ যান ব্যবহার করিতে হয়। যাহার ভাড়া নৌপথের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ইহাতে করিয়া মোট খরচ বাড়িয়া যায়। অপরদিকে, অভ্যন্তরীণ বাজারেও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভাঙিয়া পড়ে। তাহাতে করিয়া সরবরাহ সংকট দেখা দেয় এবং ক্রেতাকে বেশি দামে পণ্য কিনিতে হয়। যাহা প্রকারান্তরে ভোগান্তি বাড়াইবার নিয়ামকই বটে। অপরদিকে, উন্নয়নসহযোগী সংস্থাগুলোর চাপে হউক, আর অদক্ষতা কিংবা অসাবধানতার কারণে হউক, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন কিছু নীতি গ্রহণ করা হইয়াছে যাহা নিয়াও তীব্র আপত্তি রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট মহলের। নীতিনির্ধারকরা নীতি প্রণয়ন করিবেন, এমনটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তাহাদের মনে রাখিতে হইবে যে, রাতারাতি কিছুই করা সম্ভব নহে। কিংবা এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা ঠিক হইবে না, যাহা ব্যবসা-বাণিজ্যকে স্তব্ধ করিবে। প্রসঙ্গক্রমে, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞার বিষয়টি টানিয়া আনিলে অযৌক্তিক হইবে না। আমরা জানি, ষাটদিনে পণ্যের আমদানি ও বিক্রি করা সম্ভব নহে। কিন্তু ষাট দিন হইলেই স্পেশাল ম্যানসন একাউন্ট (এসএমএ) করিবার একটি নিয়ম করা হইয়াছে। যদি দিনের পর দিন হরতাল থাকে, পরিবহন ভাঙচুর, রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়, তাহা হইলে বন্দরে পণ্য খালাস করিবার কথা কেহই ভাবিবে না। যদিও নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য খালাস না করিলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও উদ্যোক্তা জানেন। তবু তাহার করিবার কিছুই থাকে না। এই যদি হয় পরিস্থিতি, তাহা হইলে কি করিয়া ষাটদিনে ব্যাংকের কিস্তি শোধ করিবেন তিনি? আগে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হইতো। এখন হলমার্কসহ অপরাপর আর্থিক কেলেংকারির ঘটনার কারণে তাহাও গুরুত্ব পাইতেছে না। কাহারো দোষের জন্য ভাল গ্রাহককে কেন দায়ভার নিতে হইবে? সব গ্রাহককে একই পাল্লায় মাপিবার বিষয়টি কি যৌক্তিক হইবে? কিন্তু ব্যাংকগুলোতে এখন তাহাই ঘটিতেছে।
ইহা সকলেরই জানা যে, উন্নয়নের জন্য সহায়ক নীতির দরকার। তাহাই যদি না থাকে, উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইবে কিভাবে? উপরন্তু, সংঘাতের রাজনীতি অব্যাহত চলিলে একজন উদ্যোক্তা, যিনি হাজার হাজার কিংবা লাখো লাখো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহার মনের অবস্থা কি হইতে পারে, তাহা কি কেহ ভাবিয়া দেখিয়াছেন? উদ্যোক্তার মনের সুখ-অসুখের কথা নহে, শিল্পের চাকা না ঘুরিলে জাতীয় প্রবৃদ্ধির চাকা যে ঘুরিবে না, তাহা কি কেহ চিন্তা করিয়াছেন? যাহারা সরকারে রহিয়াছেন, কিংবা যাহারা বিরোধীদলে রহিয়াছেন-ভবিষ্যতে সরকারে যাইবার আশা পোষণ করিতেছেন, তাহাদের উভয়েরই এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সমীচীন হইবে। না হইলে পরিস্থিতি এমন জটিল জায়গায় গিয়া ঠেকিবে যে, উভয়কেই পস্তাইতে হইবে।
