১৭ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে পাঠাতে হচ্ছে রপ্তানি পণ্য

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৫
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপাকে পড়েছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। ঘন ঘন হরতাল এবং নানা রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে অনেকেই তাদের পণ্য নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি করতে পারেননি। সমুদ্রপথে যেসব পণ্য ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছানোর কথা ছিল-সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় অনেকে সময়মত জাহাজ ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। বাধ্য হয়ে তাদের আকাশ পথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এসব পণ্যের সিংহভাগ তৈরি পোশাক। রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েকমাসে ক্রেতারা বাংলাদেশে অর্ডার বাড়িয়েছে। সে অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুতও করা হয়েছে। ক্রেতারা যথাসময়ে পণ্য পাঠানোর তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় প্রায় ১৭ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে আকাশ পথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। গতকাল সোমবার বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সামনে বিভিন্ন পণ্যের কার্টনের বড় বড় স্তূপ। খোলা আকাশের নিচে এসব রাখা হয়েছে রপ্তানির জন্য। এছাড়া কার্গো ভিলেজের বাইরে আরো অন্তত দুই থেকে আড়াইশ কাভার্ড ভ্যান অপেক্ষা করছে পণ্য খালাসের জন্য। এমনিতেই কার্গো ভিলেজের জায়গাটি ছোট হওয়ায় সব পণ্য একসঙ্গে নামানো যায় না। বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের বিমান আসলে সেগুলো ভর্তি হবার পর নতুন করে আবারো পণ্য এনে হাজির করছেন রপ্তানিকারকরা। গত কিছুদিন ধরে এ অবস্থা চলছে। রপ্তানিকারকরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি কেজি পণ্য রপ্তানি করতে খরচ পড়ে ২০ সেন্টের (১৬ টাকা) কাছাকাছি। আর আকাশ পথে প্রতিকেজি পণ্য পাঠাতে খরচ হয় সাড়ে তিন মার্কিন ডলারের (২৮০ টাকা) মতো। তবে যখন আকাশ পথে পণ্য পরিবহনের চাপ কম থাকে তখন প্রতিকেজি পণ্য পাঠাতে খরচ হয় সোয়া দুই থেকে আড়াই ডলার। রপ্তানিকারকরা আরো জানান, অনেকেই অর্ডার বাতিল হবার ভয়ে আকাশপথে নিজ খরচে পণ্য পাঠিয়ে দেন। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ক্রেতা এবং রপ্তানিকারক উভয়েই বহন করেন। তবে এরও ব্যতিক্রম আছে বলে জানালেন অনেকে। দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের সাথে সম্পর্ক আছে- এমন ক্রেতারা বিমানভাড়ার পুরোটাই পরিশোধ করেন। তবে অধিকাংশ সময়ে রপ্তানিকারকদের পকেট থেকে এ অর্থ দিতে হচ্ছে। জানা গেছে, সামপ্রতিককালে বেশ কয়েকদিনের হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেকেই সড়ক পথে পণ্য পরিবহনে আগ্রহবোধ করছে না। সে সময় রপ্তানি পণ্যবাহী কয়েকটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে রপ্তানিকারকরা ভয় পাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- এমন আশায় বসে থাকলেও অনেকে জাহাজ ধরতে পারেননি। এতে করে তারা আকাশ পথে পণ্য পাঠিয়েছেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমাসে কার্গো ভিলেজ দিয়ে প্রায় ১০ হাজার টন পণ্য রপ্তানি করা হয়ে থাকে। সামপ্রতিককালে যেভাবে চাপ বেড়েছে তাতে প্রতিমাসে রপ্তানির পরিমাণ ১৫ হাজার টন ছাড়িয়ে যাবে। এত বিশাল পণ্যের নিরাপত্তা বিধান করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে রপ্তানি পণ্য রাখার তেমন জায়গা নেই। প্রতিনিয়ত এখান দিয়ে পণ্য রপ্তানির হার বাড়ছে। সাথে সাথে সমস্যাও বাড়ছে। বৃষ্টিতে ভিজে পণ্য নষ্ট হচ্ছে হরহামেশাই। এছাড়া চুরির ঘটনাও বাড়ছে। বিমানবন্দর দিয়ে রপ্তানির সাথে জড়িত এমন একটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, রপ্তানির চাপ থাকায় আমরা হিমশিম খাচ্ছি। প্রতিদিন ট্রাকভর্তি পণ্য আসছে। কার্গো ভিলেজের নিজস্ব কোন শেড না থাকায় পণ্যগুলো বাইরে স্তূপ করে রাখা হয়। ওই কর্মকর্তা জানান, যে কোন সময় বৃষ্টি হলেই কার্টনভর্তি পণ্য ভিজে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে যে কেউ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এদিকে, আকাশপথে রপ্তানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় এয়ারলাইন্সগুলো পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ সময়ে ইউরোপমুখি কার্গোগুলোর প্রতিকেজির ভাড়া সোয়া দুই থেকে আড়াই ডলার থাকে। এখন সে ভাড়া উঠেছে সাড়ে তিন ডলারে। আবার সবসময় কার্গোর চাপের কারণে বুকিংও মিলছে না। এজন্য অনেক বড় রপ্তানিকারক কার্গো বিমান ভাড়া করে পণ্য পাঠাচ্ছেন। এতে খরচ বেশি হলেও পরের অর্ডারগুলো ধরে রাখার স্বার্থে তারা তা করে যাচ্ছেন।