সময় তখন সকাল দশটা। সবার মধ্যে আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। কালো গাউন পরা গ্র্যাজুয়েটদের পদচারণা। আর ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে ভরে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন স্পটে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীরা। একক, দ্বৈত ও গ্রুপসহ বিভিন্ন ধরনের ভঙ্গিতে ছবি তোলা শুরু হয়েছে। এ যেন ছবি তোলার এক প্রতিযোগিতা। আজ শিক্ষা জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হবে ডিগ্রি। তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে এত আয়োজন। এমন দৃশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সকালবেলার। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে ছিল সমাবর্তনে অংশ নেয়া গ্র্যাজুয়েটদের পদভারে মুখর। সমাবর্তনে অংশ নিতে এসেছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উম্মে হাবিবা। সমাবর্তনে অংশ নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই বিরল সম্মাননা পেয়ে আমি গর্বিত। আজ আমি খুব আনন্দিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা খুবই মনে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে যা শিখেছি, তা অন্য কোথাও থেকে শেখা যাবে না। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আজ সার্টিফিকেট নিতে এসে আমি যেন আবার ক্যাম্পাস জীবনে ফিরে এসেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম সমাবর্তনে ৩৮ জন গবেষককে পিএইচডি, ৩৪ জনকে এমফিল, ৩৭ জনকে স্বর্ণপদক ও সাত হাজার ৮০০ জনকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করা হয়। তবে এবারের সমাবর্তনের বিশেষ দিক হচ্ছে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লজ’ ডিগ্রি প্রদান। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রণব মুখার্জি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পৌঁছান। রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আচার্য মো. জিল্লুর রহমান এবং উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তাকে অভ্যর্থনা জানান। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সব সম্ভাবনার উত্স। আজ যারা এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হচ্ছে, তাদের ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যত্। এ সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশকে একযোগে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ প্রবৃদ্ধি যেন দুই দেশের মানুষের জন্য আরো বেশি সুযোগ সৃষ্টি করে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া ব্যক্তির উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। শুধু আর্থিক ও বৈষয়িক উন্নতি জাতি বা ব্যক্তিকে সামগ্রিক কল্যাণ দিতে পারে না। দক্ষ মানবসম্পদ হিসাবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি মানবসেবা ও দেশসেবার মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য গ্র্যাজুয়েটদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রমুখ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর প্রথমদিন থেকে বন্ধুত্ব হয়েছিল ইতিহাস বিভাগের তমা ও ইমনের। আজও অটুট রয়েছে সেই বন্ধুত্ব। লাফিয়ে লাফিয়ে দুই বন্ধু ছবি তুলছিলেন। সবার সঙ্গে একত্রে ছবি তুলতে তুলতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছিলেন তমা। দলবেঁধে এপাশ থেকে ওপাশে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন মেহেদিনা জামাল, পনির, সানজিদা, রুবেল। বিভিন্ন বিভাগের বন্ধুদের নিয়ে এই দল যেখানে যাকে পাচ্ছেন, তাকে সঙ্গে নিয়ে ছবি তুলছেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, মুনা এখনই বাসায় ফিরতে চায়। বাদ সাধলেন সহপাঠী সাবিহা। মুনা বললেন, আজ একটু দেরি হলে সমস্যা নেই। কেউ কিছু বলবে না। সমাবর্তন নিয়ে মুনা বলেন, আমি যা শিখেছি, যা পেয়েছি তা তো সব এসব মানুষের কাছ থেকে। তাদের সঙ্গে আজ একটু বেশি আড্ডা দিলে দোষ কি। আমি অনেক শিখেছি আমার প্রিয় শিক্ষক আর ক্যাম্পাস থেকে। আমি কৃতজ্ঞ আমার ক্যাম্পাস, শিক্ষক আর সহপাঠীদের কাছে। হয়তো আর এমন করে ফেরা হবে না এই প্রিয় ক্যাম্পাসে, পারব না আগের মতো আড্ডায় ডুবে যেতে। তবুও বারবার মনে পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা। ক্যান্টিন, লাইব্রেরি ও ক্যাম্পাসের পাশের চায়ের দোকানের এ আড্ডার কথা ভোলা যাবে না। এই সমাবর্তনের দিনের কথা মনে থাকবে আমার আজীবন।
