মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা মো. মোবারক হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে আগামী ৪ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল মঙ্গলবার এই আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মোবারকের বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থার প্রস্তুতকৃত অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। গতকাল এই অভিযোগপত্র আমলে নেয়া হবে কি হবে না এ বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য ছিল। অভিযোগপত্র আমলে না নেয়া এবং মোবারকের জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন তার আইনজীবী মো. মহিবুর রহমান। জামিনের বিরোধিতা করে ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সাহিদুর রহমান। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে ইতিপূর্বে দেয়া জামিন বাতিল করে মোবারককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদেশে বলা হয়, অভিযোগপত্র, সাক্ষীদের জবানবন্দি, তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল মনে করে মোবারকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল এসব অভিযোগ আমলে নিয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোবারকের বিরুদ্ধে গত ২৩ জানুয়ারি তদন্ত সম্পন্ন করে মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে ৩৩ জনকে গণহত্যা, ৩ জনকে হত্যা, দুইজনকে অপহরণ করে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, মোবারকের গ্রামের বাড়ি আখাউড়ার নয়াদিল গ্রামে। একাত্তরে তিনি স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের তৈরি করা রাজাকারদের তালিকায় তার নাম আছে। একাত্তর-পরবর্তী সময়ে তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। পরে তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। এক পর্যায়ে আখাউড়ার মোগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হন। দুই বছর আগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের ২১তম সাক্ষী আবুল বশর (৬৫)। আবুল বশর তার সাক্ষ্যে বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা নিজেরা মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ তৈরি করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট গোমদণ্ডি মেস কোয়ার্টারের রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করি। এ ঘটনায় আমাদের কমান্ডার ফজলু ওস্তাদ এবং রেজাউল করিম বেবি শহীদ হন ও ওয়াজেদ নামে একজন আহত হন। তিনি বলেন, এর একদিন পর সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি আর্মি নিয়ে এসে আহত ওয়াজেদের মুখে থু থু দেন এবং তাকে গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিহত দুই ব্যক্তির লাশ কোথায় ফেলা হয়েছে তা আমার জানা নেই। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
এর আগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তান পার্লামেন্ট মেম্বার অব প্রিভিলাইজড অ্যাক্ট ১৯৬৫ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত বিধি-বিধান বর্তমান ট্রাইব্যুনাল আইনে কার্যকর করার আবেদন জানান। এতে বলা হয়, সংসদ শুরুর আগে এক সপ্তাহ এবং শেষের এক সপ্তাহ পর্যন্ত কোন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলবে না। এ আবেদনের পক্ষে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজে শুনানি করেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেন, ওই আইন এখনো বলবত্ আছে। সুতরাং সংসদে যোগ দেয়ার সুযোগ না দিয়ে আমার বিরুদ্ধে বিচার চলতে পারে না। তিনি এ আইনে একজন সংসদ সদস্যকে যে অধিকার দেয়া হয়েছে তা অব্যাহত রাখার দাবি করেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানির জন্য আগামী ১৮ মার্চ দিন ধার্য করেন।
