রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভেঙ্গে গেছে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৩, ২২:২৫
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। অনিশ্চিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে আমদানি পণ্য খালাস করতে যেমন বিলম্ব হচ্ছে, তেমনি দেশে উত্পাদিত পণ্যও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কাঁচামাল বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল পণ্যের ব্যবসায়ীরা। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে পরিবহন খরচ ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। চট্টগ্রামের সর্ববৃহত্ পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন গোডাউনে মালামালের স্তূপ পড়ে আছে। উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে আমদানি করা এসব পণ্যের ব্যব-সায়ীরা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। এই বাজারে প্রতিদিন ৯০০ কোটি থেকে এগারোশ’ কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হতো। গত কয়েকদিন পরিবহনের অভাবে তা দুই থেকে আড়াইশ’ কোটি টাকায় নেমেছে। যেসব ব্যবসায়ী কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি করেন তাদের কারখানায় কাঁচামালের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবহন কোম্পানি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাদের গাড়ি ভাড়ায় খাটাচ্ছেন না। ফলে পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছগির আহমেদ ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, খাতুনগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে যেতেন। গত ১০ দিন ধরে ব্যবসায়ীরা এখানে তেমন আসছেন না। পরিবহন কোম্পানিগুলোর অনেকেই গাড়ি বন্ধ রেখেছেন। আবার যে কয়টি পরিবহন রাস্তায় নেমেছে সেগুলোর ভাড়া অস্বাভাবিক। উচ্চ পরিবহন ব্যয় দিয়ে পণ্য পরিবহন করে অনেকে লোকসানের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা সাধারণত ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে পণ্য আমদানি করে। কিন্তু পণ্য বিক্রি না হওয়ায় অনেকের গুদাম এখানো মালামালে পূর্ণ হয়ে আছে। এতে আমদানিকারকদের ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, খাতুনগঞ্জের পাইকারী বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যপণ্যগুলো সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ছগির আহমেদ খাদ্যপণ্য পরিবহনকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন। এদিকে শুধু ভোগ্যপণ্য নয়, যেসব উদ্যোক্তা পণ্য রপ্তানির জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করেন তাদের অবস্থা আরো করুণ। হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে অনেকের কাঁচামাল আটকে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল বিশেষ করে তুলা এবং অন্যান্য পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করা যাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বড় উদ্যোক্তা ইত্তেফাককে বলেন, গত ১০ দিন আগে তার আমদানি করা তুলা চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে তিনি তা খালাস করতে পারছেন না। এদিকে কাঁচামাল না থাকায় তার কারখানার উত্পাদন বন্ধ হবার উপক্রম। অবশেষে তিনি গতকাল রাতে উচ্চ ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের নিশ্চয়তা পেয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত একমাসে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বাড়তি এ ভাড়া গুনতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এছাড়া হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গত কয়েকদিনে কয়েকশ’ পরিবহন আগুনে পুড়িয়ে দেয়ায় অনেক পরিবহন কোম্পানি তাদের গাড়ি বন্ধ রেখেছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহন করেন এমন একটি পরিবহন কোম্পানি রোড় টাইগার এক্সপ্রেস এর স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, হরতালে বাধ্য হয়ে পরিবহন ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানে পণ্য পরিবহনে ব্যয় ২২ হাজার টাকা বলে তিনি জানান। তবে একমাস আগে এ ব্যয় ছিলো ১৪ হাজার টাকার কিছুটা বেশি। এছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পণ্য পাঠাতে একটি কাভার্ড ভ্যানে বর্তমানে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হলেও একমাস আগে তা ছিলো ১০ হাজার টাকা। তিনি আরো জানান, হরতালের কারণে গাড়ি চলাচল না করায় অনেক পণ্য জমে যায়। এতে গাড়ির সংকট তৈরি হওয়ায় পরিবহন ব্যবসায়ীরা গাড়ির ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। জানা গেছে, গত ১৫ দিনে হরতালকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে পরিবহন মালিকরাও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। জানা গেছে, শুধু রপ্তানি বা আমদানির ক্ষেত্রেই নয়, দেশের উত্পাদিত পণ্য বিভিন্ন জায়গায় বিতরণের ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়েছেন। রাস্তায় গাড়ি আক্রান্ত হওয়ায় অনেকে পণ্য পরিবহনে উত্সাহিত হচ্ছেন না। এতে করে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।