ইটকাঠের নীরবতার এই নগরে তারা গানের নাগরিক। এরই মাঝে যারা জয় করে নিয়েছেন নাগরিক মন। নগরের এই গানের দলটির কথকথা নিয়েই আমাদের এই আয়োজন। লিখেছেন মুহম্মদ কবীর
কংক্রিট শরীরের অলিতে গলিতে ক্লান্তিতে গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে ফিরে পাওয়া যায় সকালের প্রাণবন্ত কোলাহলে। এ রকম হাজারো বৈপরীত্যের তুমুল সমাবেশ আমাদের নাগরিক জীবন। এ জীবনকেই তারা অনুবাদ করেন গান। শুধু তাই নয়, বহমান এই নাগরিক মিছিলে তারা শামিল হলেন ‘নাগরিক’ শিরোনামে।
বয়সে কিশোর কয়েকজন বন্ধু মিলে গড়েছিলেন এই দল। বিশাল কোনো উদ্দেশ্যে নয়, স্রেফ গানের প্রতি একটা ভালোলাগা কাজ করেছিল তাদের মধ্যে। তারা তখন ভাবেননি—এই দলটি একদিন বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতে শক্ত জায়গা করে নেবে, নাগরিক জীবনের নানা উত্থান-পতনের বাস্তবতার ভেতর দিয়েই তাদের যেতে হবে। এ কথা বলার কারণ, ব্যান্ডটির লাইনআপ এমনকি নামেও নানা অদল-বদল হয়েছে, শুধু বদলায়নি তাদের গানের শক্তি। তাদের দলটির জন্ম ১৯৯৫-৯৬ সালে। কৈশোরের উচ্ছলতায় তখন দলটির নাম ‘মরফিয়াস’, মানে স্বপ্ন দেবতা। এরপর দীর্ঘসময় এই নাম নিয়েই চলে তাদের গানের অনুশীলন। গিটার, কি-বোর্ড আর ড্রামের শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা। এই সময় এই দলে ছিলেন রাইয়্যান (বেইজ), লিটন (ড্রামস), গগন (কি-বোর্ড) ও রাসেল (কণ্ঠ ও লিড)। এই চারজন মানুষের তখন একটাই স্বপ্ন—গান। কিন্তু বাস্তবতা বরাবরই নির্মম। সময়টা ২০০১ সাল। পরিবর্তন আসে ব্যান্ডের লাইনআপে। রাইয়্যান, লিটন ও গগন চলে গেলে ব্যান্ডে যোগ দেন নাজিম, মিঠু ও তিমাম। সাথে বদলে যায় এর নামও। নাম হয় ‘নাগরিক’। অবশ্য লাইনআপে এরপরেও পরিবর্তন এসেছে। নাজিমের স্থলে যোগ হয়েছেন নাঈম। তবে নামের আর পরিবর্তন হয়নি। এই নিয়ে নাগরিকের ভাষ্য হলো, ‘ওই সময়টায় ইংরেজি গান খুব শুনতাম। গাইতামও ইংরেজি গান। কিন্তু গানটা যখন মনের সাথে সাথে চেতনাও দখল করে নিল তখন নিজেদের দিকে তাকালাম। নিজেদের বাঙালি সত্তা ও ঐতিহ্যই আমাদের তাড়িত করল বাংলা নাম খুঁজে নিতে। আর নাগরিক শব্দটির মাঝেই আমাদের চেতনার চিহ্ন খুঁজে পেলাম।’
নাগরিকের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। ব্যান্ডের জন্মের এক যুগের বেশি সময় পর শ্রোতাদের হাতে আসে তাদের প্রথম অ্যালবাম। যার শিরোনাম ব্যান্ডের নামেই। অর্থাত্ ‘নাগরিক’—জি সিরিজের ব্যানারে মোট ১০টি গানের একটি অ্যালবাম। মেলো হার্ড রকের এই গানগুলো সহজেই শ্রোতাদের মনোযোগ কাড়ে। বিশেষ করে অ্যালবামের ‘স্বাধীনতা’, ‘মন কতদূর’ ও ‘মধ্যরাত’ গানগুলো শ্রোতানাকূল্য বেশি পেয়েছে। প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের অভিজ্ঞতা নাগরিক শেয়ার করল এভাবে, ‘প্রথম অ্যালবামে চেয়েছি নিজেদের অস্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরতে। তাই গানগুলোর সবকিছুতেই ছিল আমাদের অখণ্ড মনোযোগ। ফলাফল হিসেবে শ্রোতাদের সাড়াও ছিল আশাতীত।’ প্রথম অ্যালবামের সাফল্য নাগরিককে দ্বিতীয় অ্যালবামের কাজ শুরু করতে সাহায্য করেছে। প্রকাশিতব্য অ্যালবামের বেশ কয়েকটি গানও ইতোমধ্যে শেষ করে এনেছেন তারা। এগুলো হলো, ‘তুমি নেই’, ‘মধ্যরাত পার্ট-২’ ও ‘পুরোনো স্টেশন’। এই অ্যালবাম নিয়ে নাগরিক বলেন, ‘অল্টারনেটিভ রক ও পিউর রক ধাঁচের গান রয়েছে এই অ্যালবামে। এ ছাড়াও খুব চেষ্টা করছি প্রথম অ্যালবামের চেয়েও ভালোকিছু করতে।’
ব্যতিক্রমী কিছু করার পক্ষপাতি নাগরিকের আত্মবিশ্লেষণ হলো, ‘আমাদের পরস্পরের বুঝাপড়া চমত্কার। আমাদের সবার একটাই স্বপ্ন গান। আর গানের জন্য আমাদের কাছে নাগরিকের কোনো বিকল্প নেই। তাই আমরা শুধু একটি ব্যান্ড দল নই, একটি অখণ্ড অস্তিত্ব।’ এই ঐক্য নাগরিকের শক্তি। এই শক্তিকে যখন তারা গানে রূপান্তরিত করেন তখন তাকে রুখে দাঁড়ায় এমন কোনো নীরবতা নেই। নাগরিকের এই দুর্নিবার পথ চলার বর্তমানটা জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের সমস্ত মনোযোগ প্রকাশিতব্য অ্যালবামটি নিয়ে। নিয়মিত প্র্যাকটিস করছি। এরই ফাঁকে বিভিন্ন টিভি লাইভ শোগুলোতেও পারফর্ম করছি।’ নাগরিকের সদস্যদের হালহকিকত জানতে চাইলে তারা জানান ব্যান্ডের দল নেতা ও কণ্ঠশিল্পী রাসেল গিটারিস্ট তিমাম, কি-বোর্ডিস্ট মিঠু—প্রত্যেকেই বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলে শব্দ সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। আর দলের অন্য দুই সদস্য—বেইজস্ট সালেক নিজের ব্যবসা ও ড্রামা নাঈম পড়াশোনা করছেন। তবে সবশেষে ব্যান্ডের সব সদস্যের একটা পরিচয়—নাগরিক। তাদের কাছ থেকে জানা যায়, খুব শিগগিরই প্রকাশ পাবে রাসেলের একক অ্যালবাম ‘নির্বাসিত জীবন’। এ নিয়ে সবার অনুভূতির কথা জানতে চাইলে উত্তরে তাদের ঐক্যের আওয়াজই পাওয়া যায়। তারা জানান এই অ্যালবাম ঘিরে দলের কারও উত্সাহ কম নয়। আর এখানেই নাগরিকের সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের এই নাগরিক একদিন বিশ্ব নাগরিকদের কাছে পৌঁছে যাবে তাদের গান নিয়ে এমনই স্বপ্ন দেখেন তারা। আর আমরাও সে আশাই রাখি।
‘নাগরিক’ যারা—
লতিফুর রহমান রাসেল (লিড ও ভোকাল), সালেক আহমেদ সিদ্দিক (বেজ), মোহম্মদ আলী রফিক মিঠু (কি-বোর্ড), রেদওয়ান ফিরোজ নাইম (ড্রাম), এসএম তিমাম জামান (গিটার)।
