কে জি মোস্তফা
বরেণ্য সুরকার ও সংগীতপরিচালক সুবল দাশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আকাশ আর মাটি’ মুক্তি পায় ১৯৫৭ সালে। গীতিকার হিসেবে আমার প্রথম ছায়াছবি ‘রাজধানীর বুকে’ ১৯৬০ সালে। সময়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়, মাত্র তিন বছর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সুরকার ও গীতিকার হিসেবে আমাদের দুজনের মধ্যে সংযোগ ঘটেনি কখনও। সুবল দা প্রায় ৩০০টি চলচ্চিত্রে সুরারোপ করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি উর্দু ছবি রয়েছে। আমার সর্বশেষ গান লেখা হয় ১৯৭৬ সালে ‘মানুষের মন’ ছবিতে। সুরকার সুবল দাশের কর্মতত্পরতা সম্পর্কে আমি ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল ছিলাম। তার অসংখ্য জনপ্রিয় গান অন্যান্য শ্রোতার মতো আমাকেও আবিষ্ট করে রাখত।
চলচ্চিত্রে আমি মূলত নন্দিত সুরকার রবীন ঘোষের সাথেই বেশি কাজ করেছি। ষাট দশক থেকে অদ্যাবধি আমার লেখা যে কটি গান এখনও সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে তার বেশির ভাগই রবীন ঘোষের সুরারোপিত। এ ছাড়া আমি কাদের জামেরী, আলতাফ মাহমুদ, করিম শাহাবুদ্দিন, বশির আহমদ, আবেদ হোসেন খান, ননী চ্যাটার্জি, সমর দাস, হেনরী গিলবার্ট, কুলেন্দু দাস, ধরি আলি মিয়া, ফজলুল হক, আবদুল হালিম চৌধুরী, খন্দকার নুরুল আলম, রাজা হোসেন খান, আনওয়ার উদ্দিন খান প্রমুখের সুরে কখনও চলচ্চিত্র, কখনও রেডিও, কখনওবা টিভির জন্য গান লিখেছি। কিন্তু সুবল দাশের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য আমার হয়ে উঠেনি।
গত ২০০৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ললিত কলাবিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন ‘সফেন’ কয়েকজন সংগীত-ব্যক্তিত্বের সাথে গীতিকার হিসেবে আমাকেও সম্মাননা ও পদক প্রদান করে। জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে সুবল দাস ছিলেন বিশেষ অতিথি। মূলত তিনিই সবার হাতে পদক তুলে দেন। আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হলে সুবল’দা সামনের সারিতে আমারই পাশে এসে বসলেন। পরবর্তী কর্মসূচি ছিল বিভিন্ন শিল্পীর সংগীত পরিবেশনা। তারই প্রস্তুতি চলার ফাঁকে সুবল দা অত্যন্ত হূদ্যতার সাথে আমার সাথে আলাপ জুড়িয়ে দিলেন যেন আমি তাঁর বহু পরিচিত, আমি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের একজন। ঘটনাক্রমে কিছুদিনের মধ্যে ‘পঞ্চস্বর’ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের শিল্পীদের পক্ষ থেকে গান লেখার অনুরোধ এল। তারা নিজ ব্যয়ে একটি অডিও সিডি-ক্যাসেট প্রকাশ করবেন। আমি সুবল দা’কে টেলিফোনে সে কথা জানালাম, তিনি সোত্সাহে রাজি হয়ে গেলেন। আমি অবশ্য একটু দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম। কেননা আগে কখনও তাঁর সাথে গান লিখিনি। তা ছাড়া অনেকদিন যাবত আমার লেখাও হয়নি। যাইহোক প্রথম যে গানটি লিখলাম, তার প্রথম চরণ—‘আমায় একলা রেখে/ তৃষ্ণা আমার হারিয়ে গেছে/শোক-পাথরের মেঘে’। তিনি কথার মর্ম জানতে চাইলেন না সাধারণত কোনো সুরকার জানার প্রয়োজন মনে করে না। তিনি বললেন কথার মর্ম জানা থাকলে সুরের সঠিক মেজাজ আসে। যাইহোক আমি বললাম, এখানে তৃষ্ণা কোনো মানবী নয়, তৃষ্ণা হচ্ছে মোহমায়া। যা একসময় মানুষকে ছেড়ে চলে যায়। মানুষ তখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। এই নিঃসঙ্গতাই সম্ভবত মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট। সুবল দা সোত্সাহে বলে উঠলেন, ‘আপনিতো আমার বর্তমান মনের অবস্থাই লিখে ফেললেন। বাইরে আমার বলতে সবই আছে, কিন্তু কেউ আমার মনের নিঃসঙ্গতা টের পায় না।’ সে যাই হোক প্রায় প্রতিদিনই তাঁর সাথে টেলিফোনে আলাপ হতো এবং টেলিফোনেই গানের চরণ শুনাতাম। কখনও নিজে কখনও বা মেয়েকে দিয়ে লিখে নিতেন। এভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে গানগুলো তৈরি হয়ে গেল।
এবার শিল্পীদের কণ্ঠে গান তুলে দেওয়ার পালা। পূর্বনির্ধারিত দিনে পঞ্চস্বরের প্রধান ইফতেখারুল ইসলাম (টিটন)-সহ শিল্পীদের নিয়ে আমি তাঁর মগবাজারস্থ বাসায় হাজির হলাম। সাদরে তিনি আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন, উষ্ণ আতিথেয়তার এবং হাস্য-রসে দিলখোলা আলাপ-আলোচনায় প্রাণের পরশ ছড়িয়ে দিলেন। বিরাট দেহের প্রাণবন্ত মানুষটি আসলে নিষ্পাপ শিশুর মতো ছিলেন অতি সরল। সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সুযোগ্য সন্তান সুরকার সজল দাশ ও জ্যেষ্ঠ কন্যা সুগায়িকা অর্পনা দাশগুপ্ত (রীতা)। রীতার কণ্ঠে গানগুলো আগেই তোলা ছিল। রীতার কণ্ঠ যেমন চর্চিত তেমনি সুললিত। একে একে রীতা সবকটি গান আমাদের গেয়ে শোনালেন। পরবর্তীতে রীতার কণ্ঠে ক্যাসেটে ধারণ করে গানগুলো শিল্পীদেরকে দেওয়া হলো।
যাইহোক আমার লেখা গানের প্রশংসা এবং আমার প্রতি সুবল দা’র উষ্ণ আবেগ ও অন্তরঙ্গতায় অল্পসময়ের মধ্যে আমি ঐ সিডির জন্য মোট ১৪টি গান সহজেই লিখে ফেললাম। অবশ্য তিনি সুর করেছিলেন ৬টি। বাকিগুলো দুজন তরুণ সুরকারের সুর। সম্ভবত ঐ ৬টি গানই ছিল সবুল দাশের জীবনের সর্বশেষ সুরকরা গান।
প্রয়াত সুবল দাসের সর্বশেষ সুরারোপিত অডিও ক্যাসেট ও সিডি ‘তৃষ্ণা আমার হারিয়ে গেছে’ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৫ জুলাই/২০০৫। জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সংগীতব্যক্তিত্ব কলিম শরাফী এর মোড়ক উন্মোচন করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে রবীন ঘোষ ও মোবারক হোসেন খান উপস্থিত ছিলেন। এতে অবশ্যই সুবল দাসের উপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। ১৫ আগস্ট, ২০০৫ কলকাতার এক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় অগণিত গুণগ্রাহীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। ভাবতে অবাক লাগে তিনি ৩০০টি ছায়াছবির সংগীতপরিচালক ছিলেন। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। সুবল দা’র আত্মার শান্তি হোক-কায়মনোবাক্যে এটাই প্রার্থনা।
লেখক গীতিকার, কবি ও সাংবাদিক
