গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ক্রিকেটীয় অর্থে নিস্তরঙ্গ হয়ে আছে তার জীবন। হাসপাতাল, অস্ত্রোপচার, বিশ্রাম, সংসার, বেড়ানো; এসবেই কাটছে জীবন। বল-ব্যাট-ক্রিকেট মাঠের কোনো ছোঁয়াও ছিল না। তারপরও ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে পারলেন না সাকিব আল হাসান! খেলোয়াড় সাকিবকে বিশ্রামে পাঠিয়ে বাংলাদেশ দলের ‘এক নম্বর’ দর্শক হয়ে সেই ক্রিকেটেই ছিলেন দেশের সেরা এই ক্রিকেটার।
ফোনটা পেয়ে নিজের স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততা ভেঙে ফেলে উচ্ছ্বসিত গলায় নিজেই বলে দিলেন, ‘একেবারে খাঁটি দর্শক হয়ে গিয়েছিলাম। ক্রিকেটার হিসাবেও মনে হয় এতো উপভোগ করিনি কখনো। জীবনের অন্যতম সেরা একটা অভিজ্ঞতা হলো অসাধারণ একটা টেস্ট দেখলাম।’
তার মানে গল টেস্টে আশরাফুল, মুশফিক, নাসিরদের কীর্তি শুধু সাধারণ দর্শকদেরই মাতিয়ে দেয়নি; আপাতদৃষ্টিতে একটু নিরাবেগ বলে পরিচিত সাকিব আল হাসানকেও দুলিয়ে দিয়ে গেছে এই টেস্ট।
টানা ক্রিকেটজনিত ইনজুরিতে ভুগে মাঠের বাইরে না থাকলে এই টেস্টে সাকিবের মাঠে না থাকার কোনো কারণ ছিল না। গত কয়েক মাস ধরেই ক্লান্তিজনিত এই ইনজুরিতে ভুগছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেললেও ওয়ানডে খেলা হয়নি এই ইনজুরির কারণে। এরপর বিপিএলে খেললেও অস্ট্রেলিয়ায় অস্ত্রোপচার করাতে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কা সফরের অংশ হতে পারেননি।
ফলে দীর্ঘকালের ভুলে যাওয়া এক অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে হয়েছে তাকে; টেস্ট ম্যাচের সময় দলের বাইরে থাকা। ২০০৭ সালে অভিষেকের পর টানা তিন টেস্ট খেলে বাদ পড়েছিলেন। এরপর ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফিরেছিলেন টেস্টে। সেই থেকে এই গল টেস্টের আগ পর্যন্ত টেস্ট ম্যাচের সময় একাদশের বাইরে আর কখনো থাকতে হয়নি সাকিবকে। এবার অস্ত্রোপচার সেই ভুলে যাওয়া অভিজ্ঞতাটা ফিরিয়ে দিলো। সফল অস্ত্রোপচার শেষে গত সপ্তাহে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। গতকাল স্থানীয় একটি বহুজাতিক হাসপাতালে গিয়ে সেলাইও কাটিয়ে এসেছেন। নিজেই বললেন, ‘এখন ব্যথা-ট্যথা সে রকম নেই। কাল পরশু হয়তো অনুশীলন শুরু করবো। নতুন কোনো সমস্যা না হলে দ্রুত খেলায় ফিরতে চাই।’
এই অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরা এবং সেলাই কাটানোর মাঝেই জীবনের অন্যতম উপভোগ্য পর্ব কাটালেন বলে দাবি করছেন সাকিব। সেটা নিজের কোনো কারণে নয়; সতীর্থদের কীর্তি দেখে। শ্রীলঙ্কা সফরের অভিজ্ঞতা সাকিবের ভালোই আছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটু শঙ্কাও হয়তো ছিল। সব শঙ্কা কাটিয়ে দিলো তার সতীর্থরা, ‘আসলে অন্যরকম একটা টেস্ট খেলেছে এবার দলটা। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিক থেকে তো বটেই; দলীয়ভাবেও আমরা এবার বলা যায়, প্রথমবারের মতো ঠিক যেমন উচিত, সে রকম টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পেরেছি। এক কথায় অসাধারণ।’
অসাধারণ এই পারফরম্যান্স আরও অসাধারণ হয়ে উঠেছে আশরাফুল ও মুশফিকের কারণে। সাকিবের কাছে আশরাফুলের ডাবল সেঞ্চুরি না পাওয়াটার কষ্ট যেন অন্য সব পাওয়ার চেয়ে বেশি, ‘মুশফিক ভাই তার সেরা ফর্মে আছে মনে হয়; সে এটা ডিজার্ভ করে। নাসিরও কিন্তু ভালো একটা ইনিংস খেলেছে। কিন্তু আশরাফুল ভাইয়ের ব্যাপারটায় কষ্ট পেয়েছি। ওনার ডাবলটা হওয়া দরকার ছিলো। যাক, যা হয়েছে; সেই কম নয়।’
কম তো নয়ই; অনেক কিছু। আর এই অনেক কিছুর অর্থটা কী; সেটাই বুঝিয়ে বললেন সাকিব। এই ম্যাচটায় বাংলাদেশের পারফরম্যান্স দেখে ক্রিকেট বিশ্ব একটু বেশি অবাক, কারণ দলে সাকিব-তামিমের মতো সেরা দুই ক্রিকেটারই ছিলেন না। আরও কয়েক জন ইনফর্ম ক্রিকেটার ছিলেন না ইনজুরির জন্য। আর সাকিব বলছেন, এরপরও দলের এই পারফরম্যান্স পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট বদলে গেছে।
বদলের স্বরূপটা ব্যাখ্যা করলেন সাকিব, ‘দেখুন, অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোতে একসঙ্গে চার-পাঁচ জন খেলোয়াড়ও অনেক সময় ইনজুরিতে পড়ে বা অন্য কোনো কারণে বাইরে থাকতে হয়। তারপরও দলে যারা সুযোগ পায়, তারাই পারফরম করে। এতে বোঝা যায়, বেঞ্চের শক্তিটা কেমন। বোঝা যায়, দলটায় আভ্যন্তরীণ হেলদি ফাইট কেমন জমে উঠেছে। এটা দিয়েই আমরা বড় দল, ছোট দল আলাদা করতে পারি। সে অর্থে, এখন পরিষ্কার যে বাংলাদেশ বড় একটা দল। এখন আর দু’একজন পারফরমারের জন্য দল অপেক্ষা করে না।’ দল বড় হয়ে গেছে, এটা হয়তো সত্যি। কিন্তু বাংলাদেশ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, সাকিব!
